গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

মেনু

স্বাস্থ্য প্রতিদিন===

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

স্বাস্থ্য ডেস্ক

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:০৫ পিএম, ৩১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪৮ এএম ২০২৬
সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

একদিনের পর দিন রিতা নিজের ঘরেই চুপচাপ বসে থাকে। পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না। বাইরে বের হলে মনে হয়, পথচারীরা তার মনের কথা পড়ে ফেলছে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো মানসিক চাপের কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন উপসর্গই হতে পারে সিজোফ্রেনিয়া নামের গুরুতর মানসিক রোগের লক্ষণ।

বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে বেশিরভাগ রোগীই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু অবহেলা করলে এই রোগ ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ-সব ক্ষেত্রেই বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

সিজোফ্রেনিয়া কী: সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল মানসিক রোগ, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ, আচরণ এবং বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য করতে পারেন না। ফলে তিনি এমন কিছু দেখতে, শুনতে বা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরুষ ও নারী- উভয়ই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২০ থেকে ২২ বছর বয়সে এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে রোগটি প্রথম প্রকাশ পায়।

সিজোফ্রেনিয়ার প্রকারভেদ-
প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া: এটি সিজোফ্রেনিয়ার সবচেয়ে প্রচলিত ধরণ। অন্যান্য ধরনের তুলনায় এটি সাধারণত পরে জীবনে দেখা যায়। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হ্যালুসিনেশন অথবা ভ্রান্ত ধারণা, তবে আপনার আবেগ ও কথা বলার ক্ষমতা প্রভাবিত নাও হতে পারে।

হেবেফ্রেনিক সিজোফ্রেনিয়া: এটি ‘বিচ্ছিন্ন সিজোফ্রেনিয়া’ নামেও পরিচিত এবং সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে দেখা যায়। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অসংগঠিত চিন্তা ও আচরণ, পাশাপাশি ক্ষণস্থায়ী হ্যালুসিনেশন ও ভ্রান্ত ধারণা। আপনি অসংলগ্নভাবে কথা বলতে পারেন, যা অন্যদের জন্য বোঝা কঠিন হতে পারে। এই ধরনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তরা প্রায়ই তাদের অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বর বা মুখের অভিব্যক্তিতে খুব কম আবেগ প্রকাশ করেন।

ক্যাটাটোনিক সিজোফ্রেনিয়া: এটি সিজোফ্রেনিয়ার সবচেয়ে বিরল ধরন- যার বৈশিষ্ট্য হলো হঠাৎ করে সীমিত বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া। আপনি খুব সক্রিয় থাকা এবং খুব স্থির থাকার মধ্যে বারবার পরিবর্তন করতে পারেন। আপনি খুব কম কথা বলতে পারেন এবং অন্যদের নড়াচড়া বা কথাবার্তার অনুকরণ করতে পারেন।

আনডিফারেনশিয়েটেড সিজোফ্রেনিয়া: আপনার নির্ণয়ে প্যারানয়েড, হেবেফ্রেনিক বা ক্যাটাটোনিক সিজোফ্রেনিয়ার কিছু লক্ষণ থাকতে পারে, তবে এটি স্পষ্টভাবে এগুলোর কোনো একটির অন্তর্ভুক্ত নয়।

রেসিডুয়াল সিজোফ্রেনিয়া: যদি অতীতে সাইকোসিসের ইতিহাস থাকে এবং বর্তমানে কেবল নেতিবাচক লক্ষণ (যেমন- ধীরগতির চলাফেরা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি, কম মনোযোগ, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অবহেলা) দেখা যায়; তাহলে এটি রেসিডুয়াল সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে।

সিম্পল সিজোফ্রেনিয়া: সিম্পল সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে পজিটিভ লক্ষণ (যেমন- হ্যালুসিনেশন, ভ্রান্ত ধারণা, অসংগঠিত চিন্তা) খুবই বিরল, তবে নেতিবাচক লক্ষণ (যেমন ধীর গতির চলাফেরা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি, মনোযোগের অভাব, খারাপ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা) প্রাথমিক পর্যায়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং সময়ের সঙ্গে আরও খারাপ হতে পারে।

সেনেস্থোপ্যাথিক সিজোফ্রেনিয়া: এই ধরনের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক শারীরিক অনুভূতি অনুভব করেন।

অনির্দিষ্ট সিজোফ্রেনিয়া: যদি লক্ষণগুলো সিজোফ্রেনিয়ার সাধারণ নির্ণয়ের মান পূরণ করে, তাহণে তা উল্লেখিত কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পড়ে না।

লক্ষণ: সিজোফ্রেনিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিভ্রম। রোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এমন কিছু, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। অনেকের মনে হয় কেউ তাকে অনুসরণ করছে, ক্ষতি করতে চাইছে অথবা তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। আরেকটি সাধারণ লক্ষণ হ্যালুসিনেশন। এতে রোগী এমন শব্দ শুনতে পারেন- যা অন্য কেউ শুনতে পান না। অনেকেই অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, অবাস্তব দৃশ্য দেখেন কিংবা অদ্ভুত গন্ধ বা স্পর্শ অনুভব করেন। অনেক রোগীর চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তাও বিশৃঙ্খল হয়ে যায়। একটি বিষয় থেকে হঠাৎ অন্য বিষয়ে চলে যাওয়া, অসংলগ্নভাবে কথা বলা কিংবা যুক্তিহীন আচরণ এ রোগের পরিচিত লক্ষণ। এ ছাড়া মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো কগনিটিভ সমস্যাও দেখা দেয়। অনেক রোগীর আবেগ প্রকাশ কমে যায়। পরিবার, বন্ধু বা সামাজিক পরিবেশ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি অনীহা, খুব কম কথা বলা এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা সিজোফ্রেনিয়ার নেগেটিভ উপসর্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কারণ: সিজোফ্রেনিয়ার একক কোনো কারণ এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়কে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো বংশগত প্রভাব। বাবা বা মায়ের একজন আক্রান্ত হলে সন্তানের ঝুঁকি বেড়ে যায়। উভয় অভিভাবকের মধ্যে রোগটি থাকলে সেই ঝুঁকি আরও বেশি হয়। এছাড়া মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলেও রোগটি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ডোপামিনসহ কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের অস্বাভাবিকতা আচরণ ও চিন্তায় বড় প্রভাব ফেলে। শৈশবের মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশও সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

রোগ নির্ণয়: সিজোফ্রেনিয়া নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস এবং আচরণ মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা ব্রেইন ইমেজিং করা হতে পারে, যাতে অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়। সাধারণভাবে অন্তত ছয় মাস ধরে উপসর্গ থাকলে এবং তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করলে সিজোফ্রেনিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।

চিকিৎসা: সিজোফ্রেনিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় না হলেও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, যা বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন ও অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সাইকোথেরাপি রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং দৈনন্দিন জীবন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে সহায়তা করে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে বা নিজের কিংবা অন্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হলে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া মানেই জীবন শেষ নয়। বরং এটি এমন একটি মানসিক রোগ, যার ক্ষেত্রে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়, সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক

কেএমএএ/আপ্র/৩১.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

হামে ২৪ ঘণ্টায় আরো ২ মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা ৮৩৭
৩১ জুলাই ২০২৬

হামে ২৪ ঘণ্টায় আরো ২ মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা ৮৩৭

দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপা...

রাশিয়ার এমআরএনএ ক্যানসার টিকায় প্রাথমিক সাফল্যের দাবি
৩১ জুলাই ২০২৬

রাশিয়ার এমআরএনএ ক্যানসার টিকায় প্রাথমিক সাফল্যের দাবি

রাশিয়ায় উদ্ভাবিত এমআরএনএ-ভিত্তিক ক্যানসার টিকা ‘নিওঅনকোভ্যাক’ মেলানোমা আক্রান্ত প্রথম রোগীর শরীরে কা...

বর্ষাজনিত সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে ফল
৩০ জুলাই ২০২৬

বর্ষাজনিত সংক্রমণ থেকে রক্ষা করবে ফল

স্বাস্থ্য প্রতিদিন===

পাইলস বা অর্শ রোগের কারণ, লক্ষণ ও করণীয়
৩০ জুলাই ২০২৬

পাইলস বা অর্শ রোগের কারণ, লক্ষণ ও করণীয়

হোমিওপ্যাথিক পরামর্শ========================================

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই