বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি বলছে, দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, টিকাদানের ঘাটতি এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের একাধিক বিভাগে হাম দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবিহীন অথবা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ধারাবাহিক মৃত্যুও ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৯৮ জন, যাদের অধিকাংশই শিশু। শুধু ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে; নিশ্চিত ও উপসর্গ মিলিয়ে এ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, আট বিভাগের ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তদের বেশিরভাগের বয়স পাঁচ বছরের কম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকেও উচ্চ ঝুঁকিতে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি বর্তমানে মাঝারি।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং মানুষের চলাচলকে আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে ‘হটস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার, হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীসহ ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবীদের টিকা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
আরো ৭ শিশুর মৃত্যু: এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৭২ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে গেছেন ১ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে ৮৬০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে।
একই সময়ে নিশ্চিত হামে তিনজন এবং উপসর্গ নিয়ে চার শিশুসহ মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪০ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, এখন পর্যন্ত দেশে ২৯ হাজার ৫৪৯ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ২৩১ জনের রোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ৬২ লাখ ৬৮ হাজার ৪২৮ জন শিশু টিকা পেয়েছে। এছাড়া ১২টি সিটি করপোরেশনে আরো ১০ লাখ ৭২ হাজার ৮৯০ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ও বিস্তৃত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা না হলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংক্রমিতদের সংস্পর্শে বাড়ছে হামের রোগী: দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে সংক্রমিত রোগীদের সংস্পর্শে আসার কারণে হাসপাতাল ও বাড়ি-দুই জায়গাতেই নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৯ জনের হামে আক্রান্ত হওয়া নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৮৪৫ জন রোগী এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৫ হাজার ৭২৮ জন। এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরো ১৯৪ জন।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যেখানে একজন আক্রান্ত শিশু থেকে ১২ থেকে ১৮ জন টিকা না নেওয়া শিশু পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালের তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪২৬ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ১০০ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সেখানে ৪৩৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে তীব্র শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে হাম ও চিকেনপক্সে আক্রান্ত রোগীদের একসঙ্গে রাখার বাধ্যবাধকতায় ‘ক্রস ইনফেকশন’ বাড়ছে বলে চিকিৎসকদের অভিযোগ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর ক্ষেত্রে এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। পরিবারের দাবি, অন্য সংক্রমিত শিশুর সংস্পর্শে আসার পর ওই শিশুর মধ্যেও হামের উপসর্গ দেখা দেয় এবং পরে তার অবস্থা গুরুতর হয়। বর্তমানে শিশুটি ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল কিংবা বাড়ি-সব জায়গাতেই রোগীদের আলাদা করে রাখাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়। প্রয়োজন হলে অস্থায়ী আইসোলেশন ব্যবস্থা তৈরিরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাসপাতালভিত্তিক রোগীর চাপ বেশি থাকায় অনেক সময় আলাদা আইসোলেশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব সরকারি হাসপাতালকে শয্যা সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, হাম বা সন্দেহভাজন রোগীকে শয্যার অভাবে কোনোভাবেই ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল প্রধানদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করা গেলে পরিস্থিতি আরো গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
সানা/আপ্র/২৪/৪/২০২৬