লজ্জাবতী নামটি শোনামাত্রই মনের কোণে ভেসে ওঠে হাত ছোঁয়ালেই কুঁকড়ে যাওয়ার সেই চিরপরিচিত দৃশ্য। ছোটবেলা থেকে এই উদ্ভিদটিকে নিয়ে আমাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। তবে এর বাইরের এই আকর্ষণ ছাড়াও এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে চমৎকার সব ঔষধি গুণ; বিশেষ করে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সাদা লজ্জাবতীর শিকড় বা মূল নানা রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ঘরোয়া টোটকা থেকে শুরু করে শারীরিক জটিল সমস্যার সমাধানে এর ব্যবহার বহু পুরনো।
লজ্জাবতীর বোটানিক্যাল নাম মিমোসা পুডিকা। নাম থেকেই বোঝা যায়, এই গাছটিকে স্পর্শ করলেই সে লজ্জা পায়। এই মিমোসা গাছের পুষ্টিগুণের উপর ভিত্তি করে লজ্জাবতী আয়ুর্বেদে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এর মধ্যে সাদা লজ্জাবতী গাছের শেকড় বা মূল বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকরী। আসুন আমরা সাদা লজ্জাবতী গাছের শেকড়ের উপকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
সাদা লজ্জাবতী বা মিমোসা উদ্ভিদ কী: লজ্জাবতীর বিশেষ বিষয় হল এই উদ্ভিদকে স্পর্শ করার সাথে সাথে এটি সঙ্কুচিত হয়ে যায় এবং হাত সরানো হলে এটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এই প্রজাতির উদ্ভিদ বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায়। এর ফুল গোলাপি রঙের এবং ছোট। এর মূল অম্লীয় এবং স্বাদে শক্ত। এই ছোট ভেষজ উদ্ভিদ প্রধানত আর্দ্র অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই উদ্ভিদের শেকড় ও পাতা ওষুধের আকারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদিক গ্রন্থে লজ্জাবতীর শেকড়ের অনেক গুণের কথা বলা হয়েছে। তবে আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার জন্য এটি ব্যবহার করেন, তাহলে অবশ্যই একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে লজ্জাবতীর শিকড়ের বহুবিধ উপকারিতার কথা বলা হয়েছে। তা হলো-
রক্ত আমাশয় ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: অনেক সময় অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার বা সংক্রমণের কারণে ডায়রিয়া বা রক্তক্ষরণ শুরু হলে সাদা লজ্জাবতীর শেকড় দারুণ কার্যকর। ৩ গ্রাম লজ্জাবতীর শিকড়ের গুঁড়া দইয়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ালে রক্ত ডায়রিয়ায় খুব উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া এক গ্লাস পানিতে ১০ গ্রাম লজ্জাবতীর শেকড়ের ক্বাথ তৈরি করে, সেই ক্বাথ সকাল-সন্ধ্যা খেলে রক্ত ডায়রিয়া ও ডায়াবেটিস থেকে উপকার পাওয়া যায়।
কাশির উপশম: ঋতু পরিবর্তনের কারণে কাশি হলে লজ্জাবতী উদ্ভিদ দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন। লজ্জাবতীর শিকড় পিশে বা বেটে খেলে কাশি দ্রুত উপশম হয়।
পাথর রোগ ও শ্বাসকষ্ট: এর শেকড় শ্বাসকষ্ট এবং পাথর রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত উপকারী ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এটি বিষের প্রভাব ও অত্যধিক প্রস্রাবের সমস্যা কমায়।
আলসার ও ক্ষত সারায়: লজ্জাবতীর শেকড় বা বীজের গুঁড়া সেবন করলে পেটের আলসারে উপকার পাওয়া যায়। পাশাপাশি, শরীরের কোনো স্থানে ক্ষত হলে সেখানে লজ্জাবতীর শেকড়ের পেস্ট বা প্রলেপ লাগালে দ্রুত উপশম হয়।
লজ্জাবতী গাছের শিকড়ের পাশাপাশি অন্যান্য অংশও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। তা হলো-
পাইলস বা অর্শ: লজ্জাবতী উদ্ভিদের রস ব্লাডি পাইলসের রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং উপসর্গ কমায়। এক চামচ লজ্জাবতী পাতার গুঁড়া দুধের সঙ্গে সকালে বা দিনে তিনবার খেলে পাইলসে উপকার মেলে।
গ্রন্থির প্রদাহ ও গলগণ্ড: লজ্জাবতী পাতার ১০-২০ মিলি রস নিয়মিত খেলে গলগন্ড ও গ্রন্থির প্রদাহে উপকার পাওয়া যায়।
পেট ফাঁপা ও বদহজম: লজ্জাবতী পাতার রস ৫-১০ মিলি খেলে জ্বর, জন্ডিস এবং সব ধরনের পিত্তজনিত রোগে উপকার হয়।
হাইড্রোসিল ও স্তনের শিথিলতা: পুরুষের অণ্ডকোষে পানি জমার সমস্যায় লজ্জাবতীর পাতা পিষে ফোলা অংশে লাগালে আরাম পাওয়া যায়। এছাড়া লজ্জাবতী ও অশ্বগন্ধার শেকড় পিষে পেস্ট লাগালে স্তনের শিথিলতা কমে যায়।
প্রাকৃতিক ঔষধি গুণে ভরপুর লজ্জাবতী গাছ ও এর শেকড় পুরুষের বিভিন্ন যৌন দুর্বলতা ও যৌন রোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর বলে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং স্নায়ুর দুর্বলতা দূর করতে এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। তবে যে কোনো জটিল শারীরিক সমস্যায় লজ্জাবতী বা এর ভেষজ উপাদান সেবনের পূর্বে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: অনলাইন
কেএমএএ/আপ্র/১৭.০৮.২০২৬