বাংলা গানের জগতে আলাউদ্দিন আলী ও কুমার বিশ্বজিৎ—দুই প্রজন্মের দুই পরিচিত নাম। একজন কালজয়ী সুরকার ও সংগীত পরিচালক, অন্যজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। তবে কুমার বিশ্বজিতের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আলাউদ্দিন আলীর একটি কঠোর অথচ স্নেহমিশ্রিত মুহূর্ত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
আজ কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবস। ২০২০ সালের ৯ আগস্ট তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। প্রয়াণ দিবসে তাকে স্মরণ করে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সেই স্মৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন কুমার বিশ্বজিৎ।
বিশ্বজিৎ লিখেছেন, ১৯৮২ সালে ‘ইন্সপেক্টর’ চলচ্চিত্রে জীবনের প্রথম সিনেমার গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। গানটির সুর করেছিলেন আলাউদ্দিন আলী। কিন্তু শ্রুতি স্টুডিওতে মহরত অনুষ্ঠানে সংগীতাঙ্গনের পরিচিত ও গুণী ব্যক্তিদের দেখে ভয় পেয়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
পেছন পেছন এসে আলাউদ্দিন আলী তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন চলে যাচ্ছেন। বিশ্বজিৎ তখন জানান, তিনি আর গান গাইবেন না এবং চট্টগ্রামে চলে যাবেন।
এরপরই ঘটে সেই ঘটনা, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বজিতের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে। আলাউদ্দিন আলী তাকে একটি চড় দিয়ে বলেন, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে সেরা ভাবতে হবে। আর চট্টগ্রামে চলে গেলে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।
আলাউদ্দিন আলীর সেই কঠোর কথার মধ্যেই ছিল একজন নবীন শিল্পীর প্রতি গভীর আস্থা ও স্নেহ। বিশ্বজিতের ভাষায়, সংগীতের এমন একজন মহাজনের আশীর্বাদের ছোঁয়া পাওয়া যেকোনো শিল্পীর জন্যই বড় প্রাপ্তি।
বিশ্বজিৎ জানান, ওই চড় ও উৎসাহই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি লেখেন, আলাউদ্দিন আলীর সেই স্নেহ ও উৎসাহ না পেলে ঢাকায় থাকার সাহস হয়তো তিনি পেতেন না।
প্রয়াত সুরকারকে স্মরণ করে বিশ্বজিৎ আরো লেখেন, জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি আলাউদ্দিন আলীকে অনুভব করেন এবং বিশ্বাস করেন, তার আশীর্বাদ এখনো মাথার ওপর রয়েছে।
কালজয়ী অসংখ্য গানের স্রষ্টা
আলাউদ্দিন আলী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের গানের অন্যতম সফল সুরকার ও সংগীত পরিচালক। তার সুর ও সংগীতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। এর মধ্যে রয়েছে—‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’, ‘আছেন আমার মোক্তার’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’, ‘এমনও তো প্রেম হয়’ ও ‘এ জীবন তোমাকে দিলাম’সহ বহু জনপ্রিয় গান।
১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন আলাউদ্দিন আলী। বাবা ওস্তাদ জাবেদ আলী ও চাচা সাদেক আলীর কাছেই তার সংগীতে হাতেখড়ি।
১৯৬৮ সালে যন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যুক্ত হন তিনি। পরে সুরকার আনোয়ার পারভেজের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর নিজেই সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘যোগাযোগ’ ও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন আলাউদ্দিন আলী। এর মধ্যে একবার শ্রেষ্ঠ গীতিকার এবং সাতবার সংগীত পরিচালক হিসেবে এই সম্মান পান।
বাংলা সংগীতের এই কিংবদন্তি ২০২০ সালের ৯ আগস্ট মারা গেলেও তার সৃষ্টি ও শিষ্য-শিল্পীদের স্মৃতিতে তিনি আজও অমলিন। আর কুমার বিশ্বজিতের জীবনের সেই একটি চড় যেন তারই প্রমাণ—কখনো কখনো কঠোর একটি মুহূর্তও একজন শিল্পীর সামনে খুলে দিতে পারে সাফল্যের নতুন দরজা।
এসি/আপ্র/০৯/০৮/২০২৬