‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘চুরি করেছ আমার মনটা’, ‘বন্দী পাখির মতো’, ‘অনন্ত প্রেম’সহ অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী খুরশীদ আলম। প্রায় সাড়ে চারশ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়া এই বরেণ্য সংগীতশিল্পী এখনো গানের ভুবনে সক্রিয়। চলচ্চিত্রে নিয়মিত প্লেব্যাক না করলেও বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান করছেন, পাশাপাশি প্রকাশ করছেন একক ও দ্বৈত গান।
শনিবার (১ আগস্ট) ৮১তম জন্মবার্ষিকী পালন করছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পী। তবে বিশেষ এই দিনটি নিয়েও নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বরাবরের মতো এবারও পরিবারের সদস্য ও কাছের মানুষদের সঙ্গেই সাধারণভাবে কাটবে তার জন্মদিন।
জন্মদিন ও দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে খুরশীদ আলম বলেন, “আমার জন্মদিন তো সবসময় নীরবেই পালিত হয়। কখনোই ঘটা করে পালনের অভ্যাস নেই। এবারও দিনটি খুব সাধারণভাবেই কাটবে।”
তবে সংবাদমাধ্যম ও ভক্তদের ভালোবাসায় বিশেষ হয়ে উঠবে তার এবারের জন্মদিন। এ উপলক্ষে চ্যানেল আইতে প্রচারিত হবে তার জীবন ও সংগীতযাত্রা নিয়ে নির্মিত বিশেষ সাক্ষাৎকারধর্মী প্রামাণ্যচিত্র ‘হৃদয়ে কী সুর বাজে’। প্রখ্যাত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ নির্মিত এ প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে খুরশীদ আলমের শৈশব, সংগীতে হাতেখড়ি, দীর্ঘ শিল্পীজীবনের সংগ্রাম, সাফল্য ও নানা অজানা গল্প।
প্রামাণ্যচিত্রটি নিয়ে খুরশীদ আলম বলেন, “আমার শৈশব থেকে শুরু করে পুরো সংগীতজীবনের যাত্রা নিয়ে এই প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। গানকে ঘিরে অনেক স্মৃতি ও গল্প রয়েছে এতে। আশা করি দর্শকদের ভালো লাগবে।”
দীর্ঘ সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকালে খুরশীদ আলমের মনে পড়ে পুরোনো দিনের গান তৈরির কঠিন সময়ের কথা। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিল্পীরা কীভাবে নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়ে গান তৈরি করতেন, সে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমাদের সময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। আমরা এক মাইকে গান করতাম। একটি গান নিখুঁত না হলে বারবার গাইতে হতো।”
পুরোনো দিনের গানগুলো আবার গাওয়ার সুযোগ পেলে আরো ভালো করতে পারতেন বলেও মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, “আগের গানগুলো নতুন করে গাওয়ার সুযোগ পেলে হয়তো আগের চেয়ে আরো ভালো গাইতে পারতাম। এখন প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সুযোগও অনেক বেশি। একবার গেয়েই গান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।”
সংগীতজীবনের শুরু অবশ্য চলচ্চিত্রের গান দিয়ে নয়, রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে। চাচা আবু হায়দার সাজেদুর রহমানের কাছে তার গানের হাতেখড়ি। ষাটের দশকের শুরুতে রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে সংগীতচর্চা শুরু করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজে প্রথম রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন। পরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করলে আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে রেডিওতে অডিশন দেন।
১৯৬৯ সালে বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাকের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র সংগীতে যাত্রা শুরু হয় তার। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী।
‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘যদি বউ সাজো গো, আরো সুন্দর লাগবে গো’, ‘মাগো মা’সহ অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের মাধ্যমে তিনি সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন।
তার কণ্ঠের গানে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক থেকে শুরু করে ওয়াসিম, জাভেদ, মাহমুদ কলি, আলমগীর, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন, সোহেল রানা ও বুলবুল আহমেদসহ প্রায় সব জনপ্রিয় অভিনেতা।
দীর্ঘ পথচলার এই সময়ে খুরশীদ আলম শুধু একজন গায়ক নন, তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬