যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগোত্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এ সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গত জুন মাসের মাঝামাঝি এক নারী শিক্ষার্থী অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বার্তা পাঠানোর অভিযোগ করেন। অভিযোগ ওঠার পর তাকে অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তমূলক ও অশালীন বার্তা পাঠিয়েছিলেন। পরে ভুক্তভোগীর পক্ষে বার্তার স্ক্রিনশটসহ লিখিত অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগের পর ক্যাম্পাসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অভিযুক্ত শিক্ষকের কুশপুত্তলিকা দাহ কর্মসূচি পালন করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও নিরোধ কেন্দ্রের ২৩ ও ২৪ নম্বর অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিন্ডিকেট পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই দুটি অভিযোগের একটি বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রুবেল আনছারের বিরুদ্ধেও। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
সম্প্রতি রেজাউল ইসলাম ও রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং বিজয় ’২৪ হলের ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের বিরুদ্ধে গোপনে নারী শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়।
শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। ২৩ জুলাই তারা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে ২৬ জুলাই সকালে তালা খুলে দেওয়া হলেও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলো হলো— বিজয় ’২৪ হলের ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা; যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম ও অধ্যাপক রুবেল আনছারকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা; এবং সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এ ঘটনাগুলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, শুধু একজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করাই যথেষ্ট নয়; সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সানা/আপ্র/৩১/৭/২০২৬