জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাতে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত দুই বছরে এসব এলাকার ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। দুর্যোগ কিংবা তাপপ্রবাহের পর অসুস্থ হয়েছে ৮০ শতাংশ শিশু। আর গত এক বছরে দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ ছিল ৪৯ শতাংশ শিশুর।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত শিশু-নেতৃত্বাধীন এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সংস্থাটি।
ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ) পরিচালিত জরিপে গত ৯ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ৩৮টি জেলার ১০৪টি উপজেলার ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী এক হাজার ৩৭৫ শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে অংশ নেয় সংগঠনটির ১৭২ জন শিশু গবেষক।
জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের ৫৫ শতাংশ গত দুই বছরে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ শতাংশ বন্যার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। গত এক বছরে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ থাকা শিশুদের মধ্যে ৬১৭ জন সম্মিলিতভাবে হারিয়েছে সাত হাজার ৫৬৭ শিক্ষাদিবস। অথচ দুর্যোগের সময় কী করণীয়, সে বিষয়ে বিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ বা নির্দেশনা পেয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ শিশু।
দুর্যোগের পর নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহেও সমস্যায় পড়েছে শিশুরা। জরিপে ৫৩ শতাংশ শিশু এ সমস্যার কথা জানিয়েছে। সর্বশেষ দুর্যোগের আগে মাত্র ২৫ শতাংশ শিশু আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছে এবং তা বুঝতে পেরেছে। অন্যদিকে ৪৮ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা কোনও সতর্কবার্তাই পায়নি।
দুর্যোগের অভিঘাতে শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৭ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকার শিশুদের মধ্যে এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে ৭২ শতাংশ। আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করা ৫৬১ শিশুর মধ্যে ৬৩ শতাংশ জানিয়েছে, সেখানে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার কিংবা নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপরও পড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ভাবলে তাদের ভয় লাগে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মাত্র ৪ শতাংশ শিশু।
কপ-৩১ সামনে রেখে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মতামতকে জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন। সংস্থাটি জলবায়ু-সহনশীল বিদ্যালয় নির্মাণ, অভিযোজন কার্যক্রমে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য সরাসরি অর্থায়নের দাবি জানিয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রধান বহুপক্ষীয় জলবায়ু তহবিলগুলোর মোট অর্থায়নের মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু-সংবেদনশীল উদ্যোগে সহায়তা করেছে।
সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু সংকট সৃষ্টির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। জরিপে শিশুদের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। এসব চাহিদা পূরণ এবং সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
সানা/আপ্র/৬/১১/২০২৬