বিদ্যুৎ ও গ্যাস আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণশক্তি। নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতা থেকে শিল্পায়ন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা-সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আবারো জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। খোদ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দিনে চার-পাঁচবার, কোথাও তারও বেশি বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। একই সময়ে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মানুষকে কেন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে?
সাম্প্রতিক গ্যাস পরিস্থিতি সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করেছে। মহেশখালীতে সামিটের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাসমান টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪ নভেম্বর থেকে বন্ধ হয়েছে। ৭ নভেম্বর বিকাল পর্যন্ত এটি বন্ধ থাকার কথা। পেট্রোবাংলার হিসাবে, দৈনিক প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে দুই হাজার ৭৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। অথচ টার্মিনাল বন্ধের আগে সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। পূর্বপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের সময়ও বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্রও উদ্বেগজনক। বিডিপলিসিল্যাবের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে গড়ে চার হাজার ৪৩৮ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা জ্বালানির অভাবে অব্যবহৃত ছিল। একই সময়ে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদায় গড়ে এক হাজার ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ১০৪ দিনের মধ্যে ১০১ দিনই সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা গেছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতিতে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা যুক্ত হলে সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠে।
এর অভিঘাত পড়ছে জনজীবন ও উৎপাদনব্যবস্থায়। বাসাবাড়িতে রান্না, পানির সরবরাহ ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প পুলিশের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে করা মূল্যায়নে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ৪১৩টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এর মধ্যে ১৫০টির বেশি কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ১০ থেকে ৫০ শতাংশে চলছিল। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২টি কারখানা এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। উৎপাদন ব্যাহত হলে বাড়ে ব্যয়, বিঘ্নিত হয় রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, ঝুঁকিতে পড়ে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ। শেষ পর্যন্ত এর চাপ এসে পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বিকল্প সরবরাহ সচল থাকে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা, সরবরাহ, ঘাটতি এবং আমদানি ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। হাসপাতালসহ জরুরি সেবায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, ঘন ঘন বিভ্রাটের কারণ অনুসন্ধান এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। শিল্প ও কৃষিতে জ্বালানি সরবরাহের অগ্রাধিকার নির্ধারণেও স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোনো বিলাসিতা নয়; নাগরিকের স্বাভাবিক জীবন এবং অর্থনীতির সচলতার মৌলিক শর্ত। উৎপাদনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল থাকলে সেই সক্ষমতার কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না। তাই সাময়িক আশ্বাস কিংবা দায়সারা ব্যবস্থাপনা নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ পরিচালনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। মানুষের ঘরে আলো, চুলায় আগুন এবং কারখানায় উৎপাদনের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠাই হোক রাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির প্রধান অঙ্গীকার।
সানা/আপ্র/৬/১১/২০২৬