জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাবে উন্নত দেশগুলোতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলো এআই ব্যবহার করে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের বড় সুযোগ পেতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই ঝুঁকি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মসংস্থানে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা উন্নত দেশগুলোর ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের মূল সুযোগ শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, এআই উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে দেশগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য বড় ধরনের এআই মডেল বা ব্যয়বহুল তথ্যকেন্দ্র তৈরি করাই একমাত্র পথ নয়; বরং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ও কার্যকর এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করেও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, এআইয়ের মাধ্যমে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিচার সহায়তা ও কৃষি সম্প্রসারণের মতো সেবা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্যবসা ও সরকার ইতোমধ্যে মানুষের সেবা প্রদান, তথ্য বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। যেসব দেশে দক্ষ জনবল, নির্ভুল তথ্যভান্ডার ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, সেসব জায়গায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়, কৃষিতে ফসল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা, কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এআইয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য আরো বাড়তে পারে। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি দেশ ও বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে বাজারে অসমতা, আস্থার সংকট এবং মানবাধিকারের নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এআই ব্যবহারে এগিয়ে যেতে বিশ্বব্যাংক তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। প্রথম ধাপে বিদ্যমান এআই প্রযুক্তি গ্রহণ, দ্বিতীয় ধাপে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোকে উপযোগী করা এবং তৃতীয় ধাপে নিজস্ব এআই প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, দীর্ঘদিনের অনেক সমস্যার সমাধানে এআই বড় সুযোগ তৈরি করেছে। যেসব দেশ এখন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ করবে, তারাই ভবিষ্যতে এআইয়ের সুফল সবচেয়ে বেশি নিতে পারবে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এআই ব্যবহারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত ইন্টারনেট ব্যবস্থা, স্থানীয় ভাষার তথ্যভান্ডার, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তথ্যের গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই একদিকে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি উন্নয়নের নতুন সুযোগ। যথাযথ প্রস্তুতি ও সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে প্রযুক্তিটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্প খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সানা/আপ্র/৭/৮/২০২৬