গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস, বাড়ছে হতাশা-ক্ষোভ

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ২৯ মে ২০২৬ | আপডেট: ০১:০৫ এএম ২০২৬
কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস, বাড়ছে হতাশা-ক্ষোভ
ছবি

ঢাকার আমিন বাজারে চামড়া বিক্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির -ছবি সংগৃহীত

কোরবানির ঈদের দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা চামড়ার দাম আরও কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সংগ্রহকারীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম বাড়ালেও মাঠপর্যায়ে সেই দামের প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায়ও কম দামে বিক্রি হয়েছে গরুর চামড়া। আর ছাগলের চামড়ার বাজার প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর গুলশান-২, সায়েন্স ল্যাব, পোস্তা, টাউন হল, ধানমন্ডি ও কলাবাগান ঘুরে দেখা গেছে, দিন যত গড়িয়েছে, চামড়ার দাম তত কমেছে। সকালবেলায় যে চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বিকেলের দিকে একই ধরনের চামড়ার দাম নেমে এসেছে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায়।

গুলশান-২ এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ী হালিম সকালে যে আকারের চামড়া ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, বিকেল ৫টায় এসে সেই একই ধরনের চামড়ার দাম পেয়েছেন ৭০০ টাকা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “দাম তো কমই। সকালে এই চামড়া ৯০০ টাকা কইরা নিয়া গেছে, এখন ৭০০ টাকাও কষ্টে দিচ্ছে।”

তবে স্থানীয় সংগ্রাহক ও আড়তদাররা বলছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ীই তারা চামড়া কিনছেন। ইসলাম ট্রেডার্সের প্রতিনিধি আব্দুর রশিদ জানান, প্রতি বর্গফুট চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে কেনা হচ্ছে। এর সঙ্গে লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ যোগ হয়ে প্রতি চামড়ায় আরও প্রায় ৩০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তার ভাষায়, “দাম কম হলে তো কেউ চামড়া বিক্রি করত না।”

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ছোট আকারের একটি লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ছোট চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়।

মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিনিধিরাও দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে গুলশান গোলচত্বরে দুটি চামড়া নিয়ে আসা মহাখালী রেললাইন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক আবু ইউসুফ বলেন, “দুইটা চামড়ার দাম বলছে ১ হাজার ১০০ টাকা। আমরা ভাবছিলাম দুই হাজার টাকার ওপরে পাব।” তিনি দাবি করেন, কয়েক বছর আগেও একই ধরনের চামড়া তিন হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি করেছেন।

রামপুরার আফতাবনগর থেকে দুটি মাদ্রাসার পক্ষে ১৩২টি চামড়া বিক্রি করতে আসা মো. শিহাব উদ্দিন জানান, তারা গড়ে ৫৮০ টাকা করে দাম পেয়েছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই দামে চামড়া বিক্রি করে স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিকদের টাকা দিয়ে আর কিছুই থাকবে না।”

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় চামড়া সংগ্রহকারী নজির লেদার এক্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী মো. নজির বলেন, তারা গড়ে ৫০ টাকা করে বর্গফুট দরে চামড়া কিনছেন। পরে লবণ, শ্রমিক ও সংরক্ষণ খরচ যোগ হয়ে প্রতি বর্গফুটে আরও ১০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তার দাবি, পরে ট্যানারি মালিকরা সেই দামে চামড়া কিনবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

পোস্তা এলাকায় আড়তদারদের মধ্যেও একই ধরনের শঙ্কা দেখা গেছে। শাহাদাত অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক আজীজ বলেন, “লাভের চিন্তা করছি না। এখন শুধু কিনতেছি, পরে কী দাম পাই আল্লাহ জানেন।” তিনি জানান, ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে চামড়া কিনছেন তারা। লবণ ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে প্রতি চামড়ায় আরও অন্তত ১৫০ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

চামড়া ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, ট্যানারি মালিকরা নির্দিষ্ট দাম দিচ্ছেন না। হাজী আব্দুর রাজ্জাক অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শাহাব উদ্দীন বলেন, “ওরা ইচ্ছেমতো দাম দেয়। চামড়া কেনার পর নানা অজুহাতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে দেয়। ফলে লবণের টাকাও ওঠে না।”

ফড়িয়াদের সমিতির নেতা মো. শামীম বলেন, অনেক আড়তদার ধার-কর্জ করে চামড়ার ব্যবসা করছেন। অথচ ট্যানারি মালিকদের কাছে আগের পাওনাও আটকে আছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার মাদ্রাসাকে লবণ দিলেও যারা বাস্তবে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছেন, তারা কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না।

ছাগলের চামড়ার বাজারে পরিস্থিতি আরও খারাপ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৫ থেকে ১০ টাকায় ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বিনামূল্যেও চামড়া দিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ছাগলের চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামেও গরুর কাঁচা চামড়ার বাজারে হতাশা দেখা গেছে। সেখানে অনেক জায়গায় গরুর চামড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। যদিও আড়তদাররা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, চামড়া শিল্পে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা আটকে থাকা এবং পুঁজির সংকটের কারণে পুরোনো ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার মতে, পুরোনো ব্যবসায়ীদের সহায়তা না দিলে এই খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতির প্রভাব চামড়ার বাজারেও পড়েছে। তার দাবি, এ বছর আগের তুলনায় কম পশু কোরবানি হয়েছে, ফলে বাজারেও প্রভাব পড়েছে।

এদিকে ঈদের দিন ঢাকার আমিন বাজারে চামড়া বিক্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, চামড়ার বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা অব্যবস্থাপনা যেন না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সেই দাম বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ট্যানারি শিল্প আধুনিকায়ন, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো না গেলে প্রতিবছরই কোরবানির ঈদে চামড়ার বাজারে একই সংকট ফিরে আসবে।
সানা/আপ্র/২৯/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

চীনের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ বিনিয়োগে যেতে চায় বাংলাদেশ: অর্থমন্ত্রী
১৪ অক্টোবর ২০২৬

চীনের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ বিনিয়োগে যেতে চায় বাংলাদেশ: অর্থমন্ত্রী

চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদ...

অর্থনৈতিক নীতিতে বিশ্বব্যাংকের সমর্থন, প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস আইএমএফের
১৩ অক্টোবর ২০২৬

অর্থনৈতিক নীতিতে বিশ্বব্যাংকের সমর্থন, প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস আইএমএফের

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের গৃহীত নীতি ও কর্মসূচ...

দেশের বাজারে কমলো সোনার দাম
১৩ অক্টোবর ২০২৬

দেশের বাজারে কমলো সোনার দাম

বিশ্ববাজারে সোনার দামের পতনের পর দেশেও দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।...

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হতে পারে ১০.৯ শতাংশ, আইএমএফের পূর্বাভাস
১৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হতে পারে ১০.৯ শতাংশ, আইএমএফের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আরো হতাশার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 17 ঘন্টা আগে