অনন্য হক: ভরা বর্ষায় দেশের নদ-নদী, খাল-বিল ও নিম্নাঞ্চল পানিতে টইটম্বুর। এমন মৌসুমেই সাধারণত প্রাণ ফিরে পায় শরীয়তপুরের শতবর্ষী বুড়িরহাটের নৌকার হাট। কিন্তু এবার সেই চিরচেনা চিত্র নেই। বর্ষা তুঙ্গে থাকলেও এখনও জমে ওঠেনি বেচাকেনা। ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও প্রত্যাশিত বিক্রি না হওয়ায় কিছুটা হতাশ কারিগর ও ব্যবসায়ীরা। তবে তাদের বিশ্বাস, মৌসুমের বাকি সময়ে নদ-নদীর পানি আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আবারও সরব হয়ে উঠবে এই ঐতিহ্যবাহী নৌকার বাজার।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার শেষ প্রান্তে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যা উপজেলার সীমানাসংলগ্ন বুড়িরহাটে প্রতি মঙ্গলবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বসে দেশের অন্যতম প্রাচীন নৌকার হাট। জেলার বিভিন্ন স্থানে নৌকা বিক্রি হলেও ঐতিহ্য, ইতিহাস ও কারিগরি দক্ষতার জন্য বুড়িরহাটের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। প্রতি বছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমজুড়ে এখানে নতুন ও পুরোনো কাঠের নৌকার বেচাকেনা চলে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই হাট নদীকেন্দ্রিক জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্থানীয় কৃষক, জেলে, মাঝি থেকে শুরু করে নদীঘেরা এলাকার সাধারণ মানুষ বর্ষা মৌসুমে প্রয়োজনীয় নৌকা কিনতে ভিড় করেন এখানে। একসময় আশপাশের কয়েকটি জেলার ক্রেতারাও এই হাটে আসতেন।
হাটে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে সারি সারি নতুন ও পুরোনো নৌকা সাজিয়ে বসেছেন কারিগররা। কেউ নৌকার কাঠের মান দেখছেন, কেউ দরদাম করছেন, আবার কেউ পছন্দের নৌকা কিনে বাড়ি ফিরছেন। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্রেতা এলেও সেই সংখ্যা এখনও প্রত্যাশার তুলনায় কম। ফলে বিক্রিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
নৌকা তৈরি বা মেরামতের কাজে ব্যস্ত কারিগরেরা
বুড়িরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শম্ভুনাথ পোদ্দার বলেন, ১৯৪৬ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়ের মাঠে নৌকার হাট বসছে। তবে স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্তত ৪০ বছর আগেই এখানে নৌকার হাটের প্রচলন হয়েছিল। অর্থাৎ শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এই হাটের ঐতিহ্য বহমান। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নৌকার ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের খাজনা আদায় করে না।
প্রতি বছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাটে বিভিন্ন আকৃতির কাঠের নৌকা বিক্রি হয়। নতুন নৌকার দাম ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকা এবং পুরোনো নৌকার দাম চার থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে। সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর, রুদ্রকর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর ও পাপরাইল এবং ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ও ধানকাঠি এলাকার দক্ষ কারিগররাই মূলত এসব নৌকা তৈরি করেন।
হাটে নৌকা নিয়ে আসা মরণ মাল, বাসুদেব পোদ্দার ও ক্ষিতীশ শীলসহ কয়েকজন কারিগর জানান, একজন দক্ষ মিস্ত্রি সপ্তাহে ছোট আকারের দুটি নৌকা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি নৌকা বিক্রি করে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রিদের অন্যান্য কাজ কমে যাওয়ায় তখন তাঁরা নৌকা তৈরিতেই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও লাভ কমে যাওয়ায় অনেকেই ইতোমধ্যে এই পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকায় চলে গেছেন।
সদর উপজেলার চাঁদসার গ্রামের কারিগর বিমল শীল বলেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে এই পেশায় আসেন তিনি। বাবার কাছেই নৌকা তৈরির কাজ শেখেন। এবার হাটে দুটি নৌকা বিক্রি করতে পেরেছেন।
প্রবীণ কারিগর অনিল মাল বলেন, তাঁর বাপ-দাদারাও এই হাটে নৌকা বিক্রি করতেন। তিনিও টানা ৫৫ বছর ধরে বুড়িরহাটে নৌকা বিক্রি করছেন। প্রতি বছর মে মাসে নৌকা তৈরি শুরু করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্রি করেন। কাঁঠাল, মেহগনি, গোয়ারা ও উড়িয়া জাতের আমগাছের কাঠ দিয়ে তৈরি নৌকাই বেশি টেকসই ও চাহিদাসম্পন্ন বলে জানান তিনি। বছরের বাকি সময়ে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই সংসার চালাতে হয়।
বুড়িরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল গণি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা হলেও আশপাশের সব অঞ্চলে এখনও সমানভাবে পানি ছড়িয়ে পড়েনি। ফলে নৌকার প্রয়োজনও সব জায়গায় একসঙ্গে তৈরি হয়নি। এ কারণে প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা হাটে আসছেন না। তবে মৌসুমের বাকি সময়ে বিক্রি বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।
ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর এলাকার কৃষক সাঈদ হোসেন বলেন, পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এসেছেন। চারদিকে নদীবেষ্টিত এলাকায় বর্ষা মৌসুমে কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। তখন চলাচল, কৃষিকাজ, ফসল আনা-নেওয়াসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নৌকার প্রয়োজন হয়।
সময়ের সঙ্গে যান্ত্রিক নৌযানের ব্যবহার বাড়লেও গ্রামীণ জনপদে কাঠের নৌকার গুরুত্ব এখনও কমেনি। তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শতবর্ষের ঐতিহ্য বহনকারী বুড়িরহাটের নৌকার হাট শুধু একটি বাজার নয়, নদীমাতৃক বাংলার ঐতিহ্য ও গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আরও দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
সানা/আপ্র/২৩/৭/২০২৬