তাপমাত্রা কমতে শুরু করায় উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে শীতের আমেজ উপভোগ করতে ভিড় করছেন পর্যটকেরা। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ায় মৌসুমের শুরুতে শীতের আগমনী আবহ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। সমতলের চা-বাগান, মহানন্দা নদীর পাড় ও সীমান্তবর্তী এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁদের আকর্ষণ করছে।
ঘন কুয়াশা কিংবা হিমেল বাতাসে তীব্র শীত এখনো শুরু হয়নি। দিনের বেলায় হালকা গরম থাকলেও বিকেলের পর বাড়ছে শীতের অনুভূতি। অক্টোবর-নভেম্বরের এমন আবহাওয়া প্রতিবছর স্থানীয়দের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। তবে পর্যটকদের কাছে এ সময়ের অন্যতম আকর্ষণ হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে সেখানে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রি এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত শনিবার (৭ নভেম্বর) দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রোববার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রোববার ভোরে তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ সমতলের চা-বাগানে পর্যটকদের আনাগোনা। কেউ ছবি ও সেলফি তুলছেন, কেউ দলবেঁধে খোলা রিকশা-ভ্যানে ঘুরে উপভোগ করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। সমতলের চা-বাগান, মহানন্দা নদীর পাড়, বাংলাবান্ধা শূন্যরেখা ও কাজী অ্যান্ড কাজী চা-বাগানসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা।
আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। তবে কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় পর্বতশৃঙ্গটি মেঘের আড়ালে থাকায় পর্যটকেরা সেই দৃশ্য দেখতে পারছেন না। তবু শীতের আমেজ, চা-বাগান ও সীমান্তবর্তী এলাকার শান্ত-ছায়াঘেরা পরিবেশ উপভোগে তাঁদের আগ্রহ কমেনি।
বগুড়ার মোকামতলা এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছেন স্কুলশিক্ষক জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘পূজার ছুটিতে আসতে পারিনি। তেঁতুলিয়ায় আসার ইচ্ছা অনেক দিনের। কাছাকাছি এলাকা হলেও সময়ের অভাবে আসা হয়নি। এখানে পর্যটকদের বেশ ভিড় দেখছি। কাঞ্চনজঙ্ঘা আর চা-বাগান দেখতে অনেকের আগ্রহ। আমরাও তেঁতুলিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করছি।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে কয়েকজন বন্ধু মোটরসাইকেলে পঞ্চগড়ে এসেছেন। তাঁদের একজন নেহাল আহমেদ বলেন, ‘থেমে থেমে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চালিয়ে তেঁতুলিয়ায় এসেছি। আকাশের অবস্থা ভালো নয়, তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে না জানতাম। মূলত তেঁতুলিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করতেই আসা। কয়েক বছর ধরে শীতের শুরুতে বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসি। গত বছর আসা হয়নি। মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো আর এ সময়ের প্রকৃতি উপভোগ করতে আমাদের ভালোই লাগে।’
শীতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কৃষকেরা
শীতের শুরুতে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। এ জেলায় আলু, মুলা, বেগুনসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে লালশাক, ডাঁটাশাক, ধনেপাতা, সরিষাশাক, লাফাশাক, লাউ, পুঁইশাক, পালংশাক, লাউপাতা ও কুমড়াপাতা উল্লেখযোগ্য।
জেলা শহরের কামাতপাড়া, রামেরডাঙ্গা ও তুলারডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, করতোয়া নদীর আশপাশের সবজিক্ষেতে কাজ করছেন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা। কেউ ক্ষেত থেকে লাউশাক ও লালশাক তুলছেন, কেউ সেগুলো পরিষ্কার করে বাজারে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তীব্র শীতের মধ্যেও জীবিকার তাগিদে তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
জেলা শহরের তুলারডাঙ্গা এলাকার সবজিচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে শীত মানেই আতঙ্ক। ভোরে সবজি তুলে পরিষ্কার করে বাজারে নিতে হয়। এজন্য ফজরের আগেই ঘুম থেকে উঠতে হয়। কয়েক দিন ধরে ঠান্ডা বেড়েছে, শীত এলে আমাদের কাজের কষ্ট আরও বেড়ে যায়।’
শীতকালীন সবজিচাষিরা জানান, উৎপাদন খরচ বাড়লেও অনেক সময় সবজির ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। সারসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেশি, অথচ উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করে প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না। এর মধ্যে শীতের প্রকোপ বাড়লে ভোরে মাঠে কাজ করা ও সবজি বাজারজাত করা আরও কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কম দাম—দুই দিক থেকেই সংকটে পড়েছেন তাঁরা।
শীতের প্রভাব নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবহনশ্রমিকেরাও
আবহাওয়ার পরিবর্তনে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পরিবহনশ্রমিকেরাও। রামেরডাঙ্গা এলাকার ইজিবাইকচালক কাজিমুল ইসলাম বলেন, শীতের সময় সন্ধ্যার পর থেকেই যাত্রী কমে যায়। সন্ধ্যা হলেই শহর অনেকটা ফাঁকা হয়ে পড়ে। এমনিতেই নানা কারণে তাঁদের আয় কমেছে। মানুষের হাতে টাকা নেই, তার ওপর শীতের সময় কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিদিনের আয়ে সংসার চালানো এসব মানুষের কাছে শীত মানে শুধু ঠান্ডা নয়; কাজের পরিবেশ, আয়-রোজগার ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর বাড়তি চ্যালেঞ্জ। কৃষককে ভোরে সবজি তুলতে হয়, শ্রমিককে মাঠে কাজ করতে হয়, আর চালকদের দীর্ঘ সময় সড়কে থাকতে হয়। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে তাঁদের কাজের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই তাঁদের দুর্ভোগ লাঘবে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তেঁতুলিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত শনিবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৬ ডিগ্রি এবং রোববার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ছিল ১০০ শতাংশ। বর্তমানে এলাকায় শীতের আমেজ বেশ উপভোগ্য। আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও কমে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) পঞ্চগড় শাখার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, পঞ্চগড়ে সাধারণত অক্টোবরের শুরুতেই শীতের আমেজ শুরু হয়। শীতের আগমনী বার্তা কারও কাছে পর্যটনের আনন্দ, আবার কারও কাছে জীবিকার অনিশ্চয়তা। শীত জেঁকে বসার আগেই দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। আগেভাগে অসচ্ছল পরিবার চিহ্নিত করে গরম কাপড় বিতরণ এবং শীত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, ‘পঞ্চগড়ে শীতের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে আগেভাগেই শীত অনুভূত হয়। এই সময়ের শীত উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকেরা আসেন। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ার সমতলের চা-বাগান ও শান্ত, ছায়াঘেরা পরিবেশ তাঁদের মুগ্ধ করে। কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি শীতকে ঘিরেও এখানে শীতকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে উঠেছে।’
তিনি আরো বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে একাধিক সভা হয়েছে। তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে পর্যটক পুলিশের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
এসি/আপ্র/০৮/১১/২০২৬