অনাদি কুমার মণ্ডল: ইতালিতে সরাসরি পাঠানো ও ভালো বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৫৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার আয়নাল হাওলাদারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী সুমন হাওলাদার (৩০) অভিযোগ করেছেন, তাঁর শ্বশুর আয়নাল তাঁকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে একাধিকবার মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করা হয় এবং প্রায় ১৭ মাস বন্দি রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে পুলিশের হেফাজতে আড়াই মাস থাকার পর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন সুমন।
সুমন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর ইউনিয়নের শোলপুর গ্রামের মান্নান হাওলাদারের ছেলে। অভিযুক্ত আয়নাল হাওলাদার একই ইউনিয়নের কালারচর গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় আয়নালের বিরুদ্ধে মাদারীপুর জজ আদালতে মানব পাচারের মামলা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
২২ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর চুক্তির অভিযোগ: সুমন হাওলাদারের ভাষ্য, তাঁর শ্বশুর আয়নাল হাওলাদার তাঁকে ইতালিতে সরাসরি বিমানে পাঠানো এবং ভালো বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ জন্য ২২ লাখ টাকা চুক্তি হয়। ২০২২ সালের ৭ জানুয়ারি পরিবারের সদস্য, শাশুড়ি মিনা বেগম, স্ত্রী কাজল এবং কালারচর গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে আয়নালের হাতে প্রথমে ১৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি চার লাখ টাকা লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।
সুমন জানান, টাকা দেওয়ার প্রায় এক মাস পর তাঁর যাত্রার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে তাঁকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই তাঁকে একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
সুমনের অভিযোগ, তাঁকে আলো-বাতাস চলাচলের অনুপযোগী একটি পরিত্যক্ত ঘরে আটকে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না; চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করা হতো। নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা তাঁর মা-বাবা ও বোনকে দেখানো হতো এবং তাঁদের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। টাকা দেওয়ার পর নির্যাতন বন্ধ করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর আবার বন্দি করা হতো বলে দাবি সুমনের।
তিনি বলেন, এভাবে তাঁকে চারবার বিভিন্ন চক্রের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রতিবার আট লাখ, নয় লাখ, ১১ লাখ বা ১২ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এভাবে প্রায় ১৭ মাস বন্দি থাকার পর কোনো উপায় না দেখে লিবিয়ার পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরে পুলিশের হেফাজতে আড়াই মাস থাকার পর স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় বাবার মৃত্যু, দাবি পরিবারের: সুমনের বোন রুনা বেগম বলেন, ভাইকে ইতালি পাঠানোর জন্য তাঁরা ধারদেনা করেছেন, সহায়-সম্বল ও জমিজমা বিক্রি করেছেন। যাত্রার আগে আয়নালকে ১৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে ভাইকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে আরো ৪০ লাখ টাকা পাঠানো হয় বলে দাবি তাঁর।
রুনা বেগমের অভিযোগ, টাকা ফেরত চাওয়া ও বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিতে গেলে আয়নাল তাঁকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেন এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। পরে আয়নালের মেয়ে ও সুমনের স্ত্রী কাজলকে দিয়ে তাঁর, সুমন, তাঁর স্বামী ও মায়ের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সুমনের মা তাসলিমা বেগম বলেন, ছেলেকে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৫৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ছেলেকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছিল, যেখান থেকে পালিয়ে না এলে তাঁর প্রাণহানিও ঘটতে পারত। ছেলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
সুমনের প্রতিবেশী কালাম হাওলাদার বলেন, ইতালি পাঠানোর জন্য প্রথমে ১৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের মাধ্যমে আরো ৪০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় সুমনের পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেশী, মুক্তিযোদ্ধা ও সালিশি ব্যক্তি আক্কাস হাওলাদার বলেন, সুমনকে ইতালি পাঠানোর জন্য আয়নালকে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আয়নাল সালিশিদের কথা শোনেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান আক্কাস হাওলাদার।
টাকা নেওয়ার কথা জানেন অভিযুক্তের স্ত্রী: অভিযুক্ত আয়নাল হাওলাদারের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে নেই। সুমনকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন। তবে তাঁর স্বামী বর্তমানে কোথায় আছেন বা কী অবস্থায় আছেন, তা জানেন না বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার তদন্ত চলছে: রাজৈর থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, আয়নাল হাওলাদারের বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করার চেষ্টা চলছে। সুমন হাওলাদার তাঁর কাছ থেকে নেওয়া ৫৮ লাখ টাকা ফেরত এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬