বিশ্বের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে সৌরশক্তি। উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবহারের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে সৌরবিদ্যুৎ। এক দশক আগেও বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ পূরণ করত সৌরশক্তি। এখন তা বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। কম উৎপাদন ব্যয়, চীনের ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতা, ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা এ পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ এখন বিশ্বের নতুন বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের সবচেয়ে বড় উৎস। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগের ১২ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পারমাণবিক বিদ্যুতের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি হয়েছে।
এমবারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেভ জোন্সের ভাষায়, বিশ্বের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাওয়া সৌরশক্তির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
পূর্বাভাস ছাড়িয়ে সৌরশক্তির উত্থান: যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও জলবায়ুনীতিবিষয়ক অধ্যাপক জান রোজেনো বলেছেন, সৌরশক্তি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। ইতিহাসে নতুন বিদ্যুৎ উৎসগুলোর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত। ২০২৫ সালে বিশ্বে নতুন করে তৈরি হওয়া বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করেছে সৌরশক্তি।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে সৌরবিদ্যুতের প্রবৃদ্ধিকে ধীরগতির বলে ধারণা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমার গতিও কম অনুমান করা হয়। বাস্তবে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে সেই হিসাব বদলে গেছে। ২০০০ সালের তুলনায় বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ গুণ। একই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে।
উৎপাদন ব্যয় কমায় বাড়ছে ব্যবহার: গত দেড় দশকে সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। প্যানেলের কার্যকারিতা বেড়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত হয়েছে এবং সিলিকন ও রূপার মতো উপকরণের ব্যবহার কমেছে। এর ফলে সৌর প্যানেল তৈরির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
চীনের বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে সৌর প্যানেলের দাম ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্যানেলের দাম বড় ধরনের কমতির মুখে পড়ে। ডেভ জোন্সের মতে, সৌর প্যানেল এখন এতটাই সাশ্রয়ী যে অনেক ক্ষেত্রে ১০০ ডলারেরও কম দামে একটি প্যানেল পাওয়া সম্ভব। তবে প্যানেল স্থাপন, বিদ্যুৎ সংযোগ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যাটারির খরচ আলাদা হতে পারে।
সৌরশক্তির সুবিধা শুধু বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জলবায়ু সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয় বাবদ প্রায় ২৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার সাশ্রয়ে ভূমিকা রেখেছে।
চীনের নেতৃত্ব, অন্য দেশেও বিস্তার: সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীন এখনো বিশ্বের শীর্ষে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য দেশেও সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দেশটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতে গত দুই বছরে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করেছে নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। অস্ট্রেলিয়ায় ৪০ লাখেরও বেশি বাড়িতে সৌর প্যানেল রয়েছে, যা দেশটির মোট গৃহস্থালির এক-তৃতীয়াংশের বেশি।
জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা অনেক দেশকে সৌরশক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাকিস্তান এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৯ সালে দেশটির মোট বিদ্যুতের ২ শতাংশেরও কম আসত সৌরশক্তি থেকে। বর্তমানে সস্তা প্যানেল, গ্রিড বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে সৌরবিদ্যুতের অংশ বেড়ে প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। যেসব এলাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে সৌর প্যানেল ডিজেলচালিত জেনারেটরের বিকল্প হয়ে উঠছে। ইথিওপিয়াও তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।
ব্যাটারি বদলে দিচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন: সৌরবিদ্যুতের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, সূর্যের আলো থাকলেই মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সন্ধ্যা বা রাতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করতে ব্যাটারি প্রয়োজন। ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন ও দাম কমে আসায় এ ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক জান রোজেনোর মতে, রৌদ্রোজ্জ্বল অঞ্চলে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির সমন্বিত ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে, রাত ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি থেকে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার এক-চতুর্থাংশের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ঋতু পরিবর্তন, মেঘলা আবহাওয়া ও বর্ষাকালে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এ কারণে ব্যাটারির পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিড, বিকল্প উৎস এবং উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
বিদ্যুতায়নের নতুন সম্ভাবনা: পরিবহন, শিল্প ও গৃহস্থালির মতো খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থা সম্প্রসারণেও সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে।
তবে পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত বিদ্যুতায়ন নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংরক্ষণ কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জুলিয়া সাউডার সতর্ক করেছেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যথেষ্ট নমনীয়তা না রেখে চাহিদা দ্রুত বাড়ানো হলে পুরো ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু বিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তির বিস্তার নয়, গ্রিডের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
নতুন প্রযুক্তিতে বাড়ছে সম্ভাবনা: সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে নতুন প্রযুক্তিও ভূমিকা রাখছে। জার্মানিতে বারান্দায় স্থাপনযোগ্য ছোট সৌর প্যানেল জনপ্রিয় হয়েছে। এগুলো সরাসরি গৃহস্থালির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সংযুক্ত করা যায়। জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষিকাজের সঙ্গে সৌর প্যানেল স্থাপনের পদ্ধতি, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রতিফলকনির্ভর সৌরপ্রযুক্তি, পেরোভস্কাইট প্যানেল ও সৌর জানালার মতো প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে।
ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ: এমবারের ডেভ জোন্সের মতে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গতি প্রথমবারের মতো কিছুটা কমতে পারে। এর একটি কারণ চীনের সৌর প্রকল্পের নীতিমালা ও সহায়তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন। আগের সুবিধা কাজে লাগাতে ২০২৫ সালে দেশটিতে রেকর্ডসংখ্যক প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল। তবে চীনের বাইরে সৌর প্যানেল স্থাপনের গতি অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জলবিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে সৌরবিদ্যুৎ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এ অগ্রগতির জন্য চীনা প্যানেলের সরবরাহ, আমদানি নীতি, বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়লেও সৌরশক্তির দ্রুত বিস্তার পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির অগ্রগতি ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এক দশক আগেও সৌরবিদ্যুতের এমন বিস্তার অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। এখন বড় প্রশ্ন সৌরশক্তি আরো বাড়বে কি না, তা নয়; বরং বিদ্যুৎ গ্রিড, সংরক্ষণব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণী কাঠামো কত দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে।
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬