গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি

জেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ

জেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশিত: ০৮:১৪ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০৯:০৯ এএম ২০২৬
পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

চারদিকে ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, কাঁসর-ঘণ্টার ঝংকার আর ঢাকিদের ছন্দময় পরিবেশনা। পছন্দের বাদক দল খুঁজছেন দুর্গাপূজার আয়োজকেরা, চলছে দর-কষাকষি। শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ঢাকিদের চাওয়া দাম অনেকটাই বেশি।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল থেকে কটিয়াদী পৌরসভার পুরাতন বাজার এলাকায় শুরু হওয়া এ হাট চলবে শুক্রবার পর্যন্ত।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাক, ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি ও ঝুমকাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাটে এসেছেন ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা। কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ সদর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকার পূজার আয়োজকেরা এখান থেকে ঢাকিসহ বাদক দল ভাড়া করে নিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ হাট শুধু ঢাকি ভাড়া করার জায়গা নয়, এটি এলাকার লোকজ সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতিরও অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে হাটের চিত্র বদলাচ্ছে। মুঠোফোন ও অনলাইন যোগাযোগের বিস্তারে সরাসরি হাটে এসে ঢাকি নির্বাচন ও চুক্তি করার প্রবণতা কমছে।

ঢাকের দলের ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি

নিয়ম অনুযায়ী, হাট থেকে শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, ঢাকিসহ পুরো বাদক দল ভাড়া করে নিয়ে যান পূজার আয়োজকেরা। পূজামণ্ডপে অবস্থানকালে তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হয় আয়োজকদের। ঢাকিদের পরিবেশনা শুনে দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের বৈচিত্র্য ও বাজানোর দক্ষতা বিবেচনায় নিয়ে পছন্দের দল নির্বাচন করেন তাঁরা। এরপর দর-কষাকষির মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তি হয়।

হাটে আসা ঢাকি ও পূজার আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর বা কয়েক বছর আগেও একটি ঢাকের দলের ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এবার একটি ঢাকের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে। তবে দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও পরিবেশনার ওপর নির্ভর করে চুক্তির অঙ্ক কমবেশি হচ্ছে। সাধারণত পূজার শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত পাঁচ দিনের জন্য ঢাকিদের ভাড়া করা হয়।

নরসিংদীর শিবপুর থেকে ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও ঝুমকা নিয়ে তিন সদস্যের দলসহ হাটে এসেছেন সতেন্দ্র মনিদাস। তিনি বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে এখানে আসি। এখানে বিশাল ঢাকের হাট বসে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন।’

দাম বেশি চাওয়ার কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের তিন সদস্যের দলের জন্য ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দাম চাচ্ছি। ক্রেতারা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বলছেন। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা হলে চলে যাব।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছেন গৌরাঙ্গ মনিদাস ও তাঁর ছোট ভাই নিত্য মনিদাস। গৌরাঙ্গ জানান, ২২ বছর ধরে তাঁরা নিয়মিত এ হাটে আসছেন। তাঁদের নিজস্ব বাদক দল রয়েছে। হাট থেকে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে যান তাঁরা।

হোসেনপুর থেকে আসা পূজার আয়োজক অশোক দাস বলেন, ‘ঢাক নিতে এসেছি। দাম কিছুটা চড়া। ১৯, ২০ ও ২২ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। দর-কষাকষি চলছে, এখনো নেওয়া হয়নি।’

কিশোরগঞ্জ সদর থেকে আসা রনজিত মোদক জানান, এবার ঢাকের হাটে দাম বেশ চড়া। তারপরও ১৬ হাজার টাকায় একটি ঢাকের দলের সঙ্গে চুক্তি করেছেন তিনি।

ভৈরব থেকে ঢাক নিতে আসা রেনোকা সরকার বলেন, ‘দুর্গাপূজার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঢাক-ঢোল। এখন অনেক জায়গায় সাউন্ড বক্স বাজানো হলেও ঢাক-ঢোল ছাড়া দুর্গাপূজা যেন পূর্ণতা পায় না। আমরা প্রতিবছর দুর্গাপূজা করি। কটিয়াদীতে ঢাকের হাট বসে শুনে এখানে এসেছি। ঢাক, ঢোল আর বাঁশির সমন্বয়ে ভালো একটা দল খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। তবে এখানে এসে পছন্দমতো ঢাক নিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। সবাই আশীর্বাদ করবেন, যেন সুন্দরভাবে এ বছর শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করতে পারি।’

যেভাবে শুরু হয়েছিল ঢাকের হাট

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ষোড়শ শতকে কটিয়াদীর চারিপাড়া গ্রামে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের প্রাসাদ ছিল। সেখানে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। পূজাকে আকর্ষণীয় করতে দূরদূরান্ত থেকে দক্ষ ঢাকিদের নিয়ে আসতেন রাজা।

প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে ঢাকিরা নৌপথে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী যাত্রাঘাটে এসে সমবেত হতেন। রাজা তাঁদের বাদ্য পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করতেন এবং সম্মানী দিতেন। ঢাকিদের এই সমাবেশ ও দল নির্বাচনের আয়োজন থেকেই হাটের সূচনা বলে মনে করেন স্থানীয়রা। পরে হাটটি বর্তমান কটিয়াদী পৌরসভার পুরাতন বাজার এলাকায় স্থায়ী রূপ পায়।

হাটের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের উদ্যোগ

বিশাল এ ঢাকের হাট পরিদর্শনে আসেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘নেতাকর্মী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের নিয়ে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ ঢাকের হাট পরিদর্শন করেছি। এটি এ এলাকার ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা আসেন। আবার বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখান থেকে ঢাক-ঢোলসহ বাদকদের ভাড়া করে নিয়ে যান।’

হাটের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের বিষয়ে সংসদ সদস্য বলেন, এখানে পয়োনিষ্কাশন, সুপেয় পানি ও যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকেই এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

প্রযুক্তির বিস্তারে ঢাকি নির্বাচন ও চুক্তির ধরন বদলালেও কটিয়াদীর ঢাকের হাট ঘিরে মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে। ঢাকের তালে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি কয়েক শতাব্দীর এ ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রত্যাশাও রয়েছে স্থানীয়দের।

এসি/আপ্র/১৬/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

বাগেরহাটে ঘরে ঢুকে দম্পতি ও মাকে মারধরের অভিযোগ
১৬ অক্টোবর ২০২৬

বাগেরহাটে ঘরে ঢুকে দম্পতি ও মাকে মারধরের অভিযোগ

বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে বসতঘরে অনধিকার প্রবেশ করে এক দম্পতি ও ওই নারীর মা...

ন্যায়বিচার ও জননিরাপত্তায় একযোগে কাজ করবে টাঙ্গাইলের প্রশাসন-আইনজীবীরা
১৬ অক্টোবর ২০২৬

ন্যায়বিচার ও জননিরাপত্তায় একযোগে কাজ করবে টাঙ্গাইলের প্রশাসন-আইনজীবীরা

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক...

মাগুরায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকের ওপর হামলা
১৬ অক্টোবর ২০২৬

মাগুরায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকের ওপর হামলা

মিজানুর রহমান: মাগুরার শালিখায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিক...

মাদারীপুরে বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মধ্যে সাদাছড়ি ও উপকরণ বিতরণ
১৬ অক্টোবর ২০২৬

মাদারীপুরে বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মধ্যে সাদাছড়ি ও উপক...

‘দৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে মাদারীপুরে বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে