সাতক্ষীরার ছয়টি নদ-নদী ও অসংখ্য খালের জমি দখলের অভিযোগে ৩০২ জনকে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই মূল উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কপোতাক্ষ নদে ১২২ জন এবং বেতনা নদীতে ১৬ জনসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও খালের জমি দখল করে মাছের ঘের, কৃষি আবাদ এবং কাঁচা-পাকা স্থাপনা তৈরি করেছেন ৩০২ জন। জেলা প্রশাসনের সরেজমিন তদন্ত ও পুনঃযাচাইয়ের ভিত্তিতে তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের বিনেরপোতা এলাকা দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে বেতনা নদী। বিনেরপোতা সেতু এলাকায় নদীর পশ্চিম তীরে সরকারি জমি দখল করে একাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বেতনা নদীর পাড়ের বাসিন্দা ও সদর উপজেলার বিনেরপোতা গ্রামের বিষ্ণুপদ মণ্ডল বলেন, ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা এসে সেখানে লাল পতাকা টাঙিয়েছেন। এরপরও সেখানে দেয়াল ও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বালু ফেলে নদী দখল করে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই এলাকার বাসিন্দা বিকাশ মণ্ডল বলেন, সেতু পয়েন্টে বেতনা নদীর পশ্চিম তীরের বড় একটি অংশ দখল করে আবু হাসান নামে এক ব্যক্তি কারখানা করেছেন। দীর্ঘদিন পার হলেও ওই স্থাপনা সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কারখানার মালিক ও ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু হাসান।
তালা উপজেলার মাগুরা পয়েন্টে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে সরকারি জমিতে একাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, ইটভাটা এবং কৃষিকাজের উপযোগী জমি তৈরি করা হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, নদীর জমি দখল করে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হোক।
তালা উপজেলার মাগুরা গ্রামের বাসিন্দা বাবলুর রহমান বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা জরুরি। এসব স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ক্ষতি করছে। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রভাব খাটিয়ে নদীর পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
দখলের কারণে জেলার নদ-নদী ও খালে পানির প্রবাহ কমে গেছে বলে দাবি করেছেন জলবায়ু পরিষদের জেলা সম্পাদক মাধব দত্ত। তিনি অবিলম্বে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
মাধব দত্ত বলেন, সাতক্ষীরার প্রধান পাঁচটি নদ-নদী হলো বেতনা, কপোতাক্ষ, মরিচ্চাপ, কাকশিয়ালী ও খোলপেটুয়া। এসব নদী দিন দিন দখল হয়ে যাওয়ায় পানির প্রবাহ কমে গেছে। নদী রক্ষায় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার দাবি জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে তাদের ওয়েবসাইটে ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা প্রকাশ করেছে। শুধু তালিকা প্রকাশ করে বসে থাকলে হবে না, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নদী না বাঁচলে জেলার কৃষি, প্রাণ ও প্রকৃতিও রক্ষা করা যাবে না।
অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে জেলা প্রশাসনকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া।
তিনি বলেন, নদী কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। তবে বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখভাল করছে। কারিগরি বা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড তা দেবে। এখনো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহায়তা চাওয়া হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান সাতক্ষীরায় এসেছিলেন। জেলা নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে তালিকা উপস্থাপনের পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযানের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জেলা প্রশাসনের প্রস্তুত করা কর্মপরিকল্পনা ও প্রকাশিত তালিকায় কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতিসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও খালের দখলের চিত্র উঠে এসেছে। এসব দখলের মধ্যে স্থায়ী-অস্থায়ী বসতঘর, মাছের ঘের, কৃষিজমি, ইটভাটা ও বিভিন্ন স্থাপনার তথ্যও রয়েছে।
এখানে “উচ্ছেদ কি হবে?”-এর বদলে শিরোনামে “উচ্ছেদ কবে” ব্যবহার করেছি। এতে প্রশ্নটি থাকে, কিন্তু সংবাদপত্রের শিরোনামটি আরো সংক্ষিপ্ত, স্বাভাবিক ও সংবাদধর্মী হয়েছে।
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬