কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম রমনাথপুর। গ্রাম থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে, গড়াই নদীর পেরিয়ে উপজেলা শহর। সেখানেই অবস্থিত উপজেলার একমাত্র সরকারি বিদ্যালয় খোকসা জানিপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
প্রতিদিন বাইসাইকেলে সেই পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতো রওনক হাসান। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। আর সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির পুরস্কারই পেল সে।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২২১ নম্বর পেয়ে যশোর বোর্ডের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে রওনক। তার রোল নম্বর ১২৩৭৫৪। সে রমনাথপুর গ্রামের শিক্ষক দম্পতি হাসানুল হাবীব ও রূপালী খাতুনের প্রথম সন্তান। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য এই ডিজিটাল যুগে এসেও রওনক হাসানের নেই কোনো স্মার্টফোন। নেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টও। অবসর সময় কাটত বই আর খাতার সঙ্গে।
রওনক জানায়, ‘আমার কোনো স্মার্টফোন নেই, ফেসবুকও নেই। অবসর সময়ে বই পড়তাম। গান গাইতেও ভালো লাগে। শিক্ষক আর বাবা-মা সবসময় পাশে ছিল। আমার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করা।’
তার ভাষ্য, সে নিয়মিত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পড়াশোনা করত। প্রাইভেট কোচিংয়ে খুব একটা পড়েনি। তবে বিদ্যালয়ে নিয়মিত যেত।
মায়ের অনুপ্রেরণা, বাবার শাসন:
রওনকের মা রূপালী খাতুন রমনাথপুর মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বাবা হাসানুল হাবীব কুমারখালীর ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক। সন্তানের সাফল্যে তারা গর্বিত।
বাবা হাসানুল হাবীব বলেন, ‘ও ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী। মোবাইল-ফেসবুকের দিকে ঝোঁক ছিল না। আমরা শুধু পাশে থেকে সাহস দিয়েছি। ওর এই সাফল্য আমাদের এলাকার জন্য গর্বের।’
মা রুপালী খাতুন বলেন, ‘ওকে কখনও পড়ার কথা বলা লাগেনি। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা নিয়মিত ও ইচ্ছে মতো পড়ত। ভেবেছিলাম পরীক্ষায় ভালো করবে। তবে বোর্ডের দ্বিতীয় হবে তা কল্পনার বাইরে। সবাই ওর জন্যে দোয়া করবেন।
১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের গর্ব রওনক:
১৯০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী খোকসা জানিপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো শিক্ষার্থী বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান করে নিলো। এতে গর্বিত স্কুলের শিক্ষকরাও। চলতি বছর ১৭৭ জনের মধ্যে ১৬৫ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে ২০ জন।
সহকারী শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রওনক খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। ক্লাসে নিয়মিত ছিল। কোনোদিন পড়া ফাঁকি দেয়নি। গড়াই নদীর ওপারের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত। ওর সাফল্য আমাদের স্কুলের জন্য মাইলফলক।’
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২২১ নম্বর পেয়ে যশোর বোর্ডে দ্বিতীয় হয়েছে রওনক। তার এই সাফল্য আমাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। আমরা চাই রওনকের মতো আরও অনেকে এগিয়ে আসুক।’
রোববার (১৬ আগস্ট) কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন খোকসা পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রিপন হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্পের নাম রওনক হাসান। নেই প্রযুক্তির বাড়াবাড়ি, আছে স্বপ্ন। নেই বিলাসিতা, আছে কঠোর পরিশ্রম। উৎসাহদানে রওনকসহ কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে।’
যশোর বোর্ড ও জেলায় দ্বিতীয় এবং খোকসায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে রওনক হাসান। এ তথ্য জানালেন খোকসা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৫ কিলোমিটার সাইকেল চালানো সেই ছেলেটি আজ প্রমাণ করলো, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। খোকসার রওনক এখন শুধু একটি নাম নয়। সে অনুপ্রেরণা। সে প্রমাণ করল গ্রাম থেকেও আকাশ ছোঁয়া যায়।’
এসি/আপ্র/১৮/০৮/২০২৬