যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পরবর্তী প্রজন্মের রোডস্টার গাড়ি উন্মোচন করেছে টেসলা। নতুন তিনটি সংস্করণের একটিতে চোখ ধাঁধানো কিকফ্লিপ বা শূন্যে উল্টে যাওয়ার কসরত দেখানো হয়েছে। এর পাশাপাশি গাড়িটির উড়তে পারার সক্ষমতাও প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে ইউরোনিউজ বিজনেসের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই মডেল থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং স্পেসএক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ‘নাইট রাইডার’ টিভি সিরিজের একটি দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন। স্পেসএক্সের প্রযুক্তিতে তৈরি শীতল গ্যাসচালিত থ্রাস্টার যন্ত্রযুক্ত একটি সুপারকার প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৌশলগত সক্ষমতা তুলে ধরেন।
এ ঘটনার পর টেসলার শেয়ারের দাম বেড়েছে। এর পেছনে মূলত গাড়িটি নিয়ে তৈরি হওয়া ব্যাপক আগ্রহ কাজ করেছে। তবে, প্রদর্শনী মুগ্ধ করলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নতুন মডেলটির বাণিজ্যিক মূল্য সীমিত।
কুইল্টার শেভিওটের ভোক্তা খাত বষয়ক বিশ্লেষক মামতা ভ্যালেচা এটিকে ‘সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম কেড়ে নেওয়ার মতো একটি প্রকৌশল প্রদর্শনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ব্র্যান্ডকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উত্তেজনা তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
আইএনজির পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা খাতের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ রিকো লুমান এই প্রদর্শনীকে ‘প্রচারমূলক কৌশল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেসলার ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়েছে যা ব্র্যান্ডের মূল্য বাড়ায়। তিনি বলেন, গাড়ি এখনো মানুষের আবেগ ও জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে, এ ধরনের প্রদর্শনী মানুষের মনে ছাপ ফেলে।
ডিপওয়াটার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার জিন মুনস্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে, এই প্রদর্শনীকে ‘বাণিজ্যিক মূল্যহীন প্রকৌশলগত দাপট প্রদর্শন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, প্রচলিত গাড়ি নির্মাতাদের বিব্রত করা ছাড়া এর তেমন কোনো বাণিজ্যিক মূল্য নেই।
ভ্যালেচা উল্লেখ করেন, ইলন মাস্ক নিজেও আগে রোডস্টার থেকে সম্ভাব্য আর্থিক আয় নিয়ে প্রত্যাশা কমিয়ে দেখিয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘এর বাণিজ্যিক মূল্য উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে টেসলার উদ্ভাবনী ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি।’
এদিকে ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, ২০২৮ সালে গাড়িটির উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। টেসলা ইতোমধ্যে গাড়িটির জন্য আগাম বুকিং নেওয়া শুরু করেছে। তবে, উড়তে সক্ষম ‘রকেট’ সংস্করণটি কেবল অগ্রিম বুকিং-এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে। গাড়িটির চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য এখনো ঘোষণা করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৭ সালে প্রথম রোডস্টার উন্মোচন করা হয়েছিল। এর এক বছর পর মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, থ্রাস্টার ব্যবহারের মাধ্যমে গাড়িটিকে ওড়ানো সম্ভব হতে পারে। এরপর উৎপাদন নিয়ে বারবার সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। মূলত ২০২০ সালেই গাড়িটির উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
ভ্যালেচার ভাষায়, ‘বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি।’
রোডস্টারের উড্ডয়নসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যগুলো জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য সড়কে চলাচলের অনুমোদন পায়নি। প্রযুক্তিটির ব্যাপক ব্যবহার চালুর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ব্যয়।
লুমান বলেন, উড়তে সক্ষম গাড়িটি একটি বিশেষ শ্রেণির স্পোর্টস কার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। তবে, অদূর ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে উড়ন্ত গাড়ির ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে যে নিয়মকানুন প্রযোজ্য, উড়ন্ত গাড়ির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। ইউরোপে এ ধরনের গাড়িকে উড়োজাহাজ হিসেবে বিবেচনা করা হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির (ইএএসএ) কাছ থেকে উড়োজাহাজের সনদ নেওয়ার প্রয়োজন হবে।’
ইউরোনিউজ বিজনেসকে ইএএসএ জানিয়েছে, গাড়িটির নকশা, সক্ষমতা এবং কীভাবে এটি ব্যবহার করা হবে তার ওপর নির্ভর করবে এটি বিমান চলাচলসংক্রান্ত বিধিবিধানের আওতায় পড়বে কি না।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট নির্মাতার সনদসংক্রান্ত আবেদন বা কার্যক্রম নিয়ে তারা মন্তব্য করে না। তবে সংস্থাটির ভাষ্য, ‘উড়োজাহাজ হিসেবে পরিচালনার জন্য তৈরি যে কোনো যানকে প্রযোজ্য বিমান চলাচল নিরাপত্তাবিধি পূরণ করতে হবে।’ এসব শর্তের মধ্যে চালকের পাইলট হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টিও থাকতে পারে।
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো টেসলাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে, ব্যয়বহুল প্রযুক্তি প্রকল্পগুলোকে আরও শক্তিশালী মুনাফায় রূপান্তর করার চাপের মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে টেসলা। কিন্তু বিক্রয় আয় বাড়লেও মুনাফা একই গতিতে বাড়ছে না। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে টেসলার আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৮২৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে, শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রাপ্য নিট মুনাফা প্রায় ৫ শতাংশ কমে ১১১ কোটি ডলারে নেমেছে।
বছরের প্রথম ছয় মাসে মূলধনি ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৮২৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের কারণে ২০২৬ সালে টেসলার মূলধনি ব্যয় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বছরের শুরুতে টেসলার শেয়ারের দাম ছিল ৪৩৮ ডলার। বৃহস্পতিবার তা কমে ৩৬২ ডলারের কিছু বেশি হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছর এখন পর্যন্ত শেয়ারের দাম কমেছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
স্পেসএক্স থেকে নেওয়া প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে রোডস্টার নিয়ে টেসলা ও স্পেসএক্সের ভবিষ্যৎ একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্যারনসের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বার্কলেসের বিশ্লেষক ড্যান লেভি ইঙ্গিত দিয়েছেন, টেসলার বার্ষিক শেয়ারহোল্ডার সভার আগেই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। তবে, এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য চুক্তিটি নিছক জল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এটি আদৌ হবে কি না কিংবা হলে কখন হবে, এ বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আপাতত রোডস্টারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারেন বিলাসবহুল গাড়ির প্রতি আগ্রহী ধনী ক্রেতারা।
কেএমএএ/আপ্র/১৮.১০.২০২৬