গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ড. ইউনূস কাণ্ড ও আওয়ামী অধিকার চর্চা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:০৫ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫০ এএম ২০২৬
ড. ইউনূস কাণ্ড ও আওয়ামী অধিকার চর্চা
ছবি

ছবি সংগৃহীত

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যখন যা করেন সব তাদের ন্যায্য অধিকার বিবেচনায় করেন। ড. ইউনূসকে নাগালের মধ্যে পেয়ে তাকে অপমান, অপদস্থ করাও ছিল তাদের ওপর ইশ্বরের চাপিয়ে দেওয়া অধিকার প্রয়োগের কিঞ্চিৎ নমুনা। তারা তাকে অপমান করবে না তো, কে করবে? তারাই বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটির মালিক-মুখতার; আব্বা আম্মা! ভাই-ভাতিজা ও ভাগিনা। তারাই স্বাধীনতার রক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক! তারাই স্বাধীনতার আসল ফসল-খোর! বাংলাদেশের স্বাধীনতার ফলমূল, শিকড়-বাঁকড় সবকিছুরই হকদার তারা।

আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ ভাইবোনদের কথাবার্তার ধারায় কারও সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, বাংলাদেশ সৃষ্টি করবেন বলেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান যাতে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে হাজার বছর যাবত বিদেশিদের দ্বারা শোষিত, নির্যাতিত, ধর্ষিত, লাথিগুতায় অতিষ্ঠ  বাঙালি জাতিকে মুক্তির মধুর শরাব পান করাতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তার পূর্ব পুরুষকে তিন সহস্র মাইল দূরের ধূঁ ধূঁ বালিকারাশির দেশ ইরাক থেকে শস্যশ্যামল বৃষ্টিস্নাত ও নদীবিধৌত নরম কাদামাটির বঙ্গদেশে হিজরত করতে বাধ্য করেছিলেন। আল্লাহর কী শান! আওয়ামী ভ্রাতাভগ্নিদের মতো আমিও বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, বঙ্গদেশে শেখ মুজিবের ‘বিলাদত’ বা জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। কস্মিনকালেও হতো না।

যদিও বিশ্ব ইতিহাস বলে যে, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এ যাবৎ ১০৫টি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে; তবুও তাতে কী! বাঙালি অন্যের ইতিহাসে বিশ্বাস করার জাতি নয়। বাঙালি জানে, ওইসব দেশ প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেনি? করতে পারে না। কারণ ওই দেশগুলোতে তো আর শেখ মুজিবুর রহমানের মতো হাজার বছরের সেরা মহান কারও আবির্ভাব ঘটেনি। তাহলে ক্যামনে কী হলো? স্বাধীনতা কি নিউটনের কোলে আপেল পড়ার মতো ওপর থেকে ওইসব দেশের জাতিগোষ্ঠীর কোলে টুপ করে পড়েছিল? কোনো দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম নেই, অথচ স্বাধীন হয়েছে! অবিশ্বাস্য! ওইসব দেশে কে কবে আল্লাহর বাণীর মতো বলেছেন, ‘কুন, ফা ইয়া কুন,’ — ‘হও, আর হয়ে গেল!’ সবই বিশ্বাস করতে হয়। কৃষকের গরু হারালে সে তালজ্ঞান হারিয়ে নিজের স্ত্রীকে ‘মা’, আর বাপকেও ‘ভাই’ ডাকে। আওয়ামী লীগের বিপরীত অবস্থা। তারা হারানো বা গোয়াল থেকে পালানো গরু ফিরে পেয়েছে। ড. ইউনূসের হেনস্তায় তারা মহা খুশি- যেন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দ-উল্লাসের ৫৫ বছর পর তাদের কিসমতে আবার সেই পরমানন্দ উপভোগের সুযোগ এসেছিল।

তাদের তাবৎ বাতচিতের মর্ম একটাই, ‘চো-দানির ফুয়া’র অর্থাৎ ড. ইউনুসের এটাই প্রাপ্য’। যেন তারা কবি শহীদ উদ্দীন আহমেদের কবিতার মতো ইউনূসকে ঘুঘু ধরার ‘ফাঁদ’ দেখিয়ে দিয়েছেন- ‘ঘুঘু দেখে খুশি তুমি, ফাঁদে তো আর পড়োনি/দেখবে এবার কেমন মজা, সোজা পথ যে ধরোনি।’ তারা ড. ইউনূসকে ফাঁদে ফেলার অবস্থায় পেয়ে যা করেছেন- তাতে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রকৃত অর্থেই তারা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা বন্দনায় নিজেদের বিলীন করা তালজ্ঞানহীন ‘ফানা ফিল্লাহ’ টাইপের মুরিদ। হতেই পারে। ইতিহাস অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন বাগদাদ নগরী থেকে আগত সুফি শেখ আউয়ালের অষ্টম বংশধর। সুফি মানেই আশেকান-মুরিদান পরিবৃত থাকা। ইউনূস সরকারের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ যেহেতু শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং আওয়ামী উম্মতদের বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার মতো ছিল। অতএব, তাদের কাছে ইউনূস ‘মহা খারাপ! সুদখোর তো বটেই! মহাচোর! চোরানে চোর!’

আওয়ামী ফেরেশতাদের সরকার ইউনূসকে চোর হিসেবে অভিযুক্ত করে তাকে সিঁড়ি ডিঙিয়ে আটতলায় আদালতে উঠিয়েছে! যেখানে সেখানে তাকে অপদস্থ করার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে? কিন্তু ইতিহাসের নানা পর্যায়ে তাদের নেট অর্জন কী? ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট! ২০২৪ এর ৫ আগস্ট! হিজরতের পর হিজরত! হত্যা, গুম, অর্থ পাচার, জবরদখলের মামলায় অভিযুক্ত! মৃত্যুদণ্ডের রায়! যদিও তারা ‘ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান’ গাওয়ার অথবা ‘রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার’ জন্য সদা প্রস্তুত, কিন্তু হিজরত করে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিতেই দুই বছর কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি তাদের সততার প্রমাণ মেলে না। এসব কথা বলতে হয়, তাই তারা বলেন।  


আওয়ামী লীগকে ২০২৪ সালে কি ড. ইউনূস উৎখাত করেছিলেন? আন্দোলনকারীরা কি তার সঙ্গে পরামর্শ করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে, এমনকি তাকে ‘সদলবলে’ পালাতে বাধ্য করেছিল? টানা সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশকে পৈতৃক সম্পত্তি বিবেচনা করে তারা জনগণের ওপর হত্যা, গুম থেকে শুরু করে সব ধরনের অত্যাচার নিপীড়ন চালিয়ে যে অপরাধ করেছে, সে অপরাধের জন্য অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা করা তো দূরের কথা, বরং একটির পর আরেকটি অপরাধ করে এবং বিশেষ করে দাম্ভিকতা ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারা যখন যা করে, সবই সঠিক, হত্যা-গুম করা, মাথা ফাটানো, দখল-চাঁদাবাজি তাদের অধিকার। তাদের ভাষায় ‘জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত জনপ্রিয় সরকার’ হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ এর নির্বাচনের মাত্র সাত মাস পর জনরোষে সদলবলে পালানো কি জনপ্রিয়তার লক্ষণ?

ইউনূসকে হেনস্তা করে আওয়ামী ভাইবোনরা যে মাত্রায় সন্তুষ্ট, ২০২৪ সালে জনগণ তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সন্তুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী যুক্তি বরাবর ন্যায্য, অখণ্ড ও কোরআনের বাণী ‘লা রাইবা ফিহি’ অর্থাৎ ‘এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই’-এর মতো অবিভাজ্য, শাণিত ও সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কেউ কিঞ্চিৎ সাহস সঞ্চয় করে আওয়ামী হাদিস ও ফরমানের ভুলত্রুটি ধরলেই তারা আওয়ামী ভাষায়- ‘পাকি বীর্যের পয়দা,’ ‘জিন্নাহর সন্তান,’ এবং ‘রাজাকারের নাতিপুতি’। একবার তীর ছুঁড়ে দিলে যেমন আর আটকানো যায় না, তেমনি মুখ থেকে বের হওয়া কথাও মুখে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। বেকায়দায় পড়ে বক্তা যখন বলেন, ‘আমি তো ওই কথা বলিনি’, বা ‘কখন এই কথা বললাম,’ তখন আওয়ামী ফেরেশতারা জিকির তোলেন, ‘উনি কখন একথা বললেন,’ অথবা ‘উনি যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা আসলে তা ছিল না।’ কবিদের কবিতার মর্ম এক এক পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন। যে যার মতো বোঝে। একমাত্র কবিই জানেন, তিনি তার ছত্রে ছত্রে, শব্দে শব্দে কী বোঝাতে চেয়েছেন! যারা আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখে না, তারা এমন ভাবতেই অভ্যস্ত। যে কথাগুলো ইউনুসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে তারা বিশ্বাস করে, সেগুলো কি আওয়ামী ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য নয়?

পাঠকগণ, যারা ধৈর্য ধারণ করে এতটুকু পাঠ করেছেন; তারা আরও একটু পাঠ না করলে জন্মকাল থেকে আওয়ামী মনস্তত্ত্বে যা খুশি, তা করার অধিকার চর্চা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে ব্যর্থ হবেন। ক’জন লোক মনে রেখেছেন যে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী? জি, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা পালনকারীদের অন্যতম হলেও তিনি দলটির কোনো পদাধিকারী ছিলেন না। তবে একটি অংশের ওপর তার ভালো নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি মাওলানা ভাসানীসহ দলের অনেকের মনে হয় যে, সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের স্বাত্ত্বশাসনের দাবির ব্যাপারে তার আগের কঠোর অবস্থানের চেয়ে অধিক নমনীয় এবং পাশ্চাত্যমুখী হয়ে পড়েছেন। তাই ভাসানী আওয়ামী লীগকে ‘স্লামালেকুম’ বলে বিদায় জানিয়ে ‘ন্যাপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই বর্তমান পুরোনো ঢাকার ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে ন্যাপের কনভেনশন আয়োজন করা হলে আওয়ামী লীগের বাকি অংশের ফেরেশতা আদমিরা কনভেনশন পণ্ড করার জন্য ‘রূপমহল’ এ চড়াও হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও প্রতিনিধিদের লাঞ্ছনা করে। ভাসানির কনভেনশন কোনোমতে শেষ হয়। একদিন বয়সি ‘ন্যাপ’ পরদিন ২৬ জুলাই পল্টন ময়দানে তাদের প্রথম জনসভার আয়োজন করে। সভায় বিপুল জনতার সমাবেশ ঘটে। কিন্তু যারা নতুন দলের আবির্ভাবের বিরোধিতা করেছিল, তারা হামলা চালিয়ে সভা পণ্ড করে দেয়। দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে এবং ঢাকা শহরে ১৪৪ জারি করা হয়। যিনি ক’দিন আগেও দলের সভাপতি ছিলেন, তাকে হেনস্থা করা আওয়ামী অধিকারের মধ্যেই পড়ে।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে গো-হারা হারিয়ে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়েছিল। ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে জয়ী হলেও যুক্তফ্রন্টে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল দুটি: কেএসপি এবং আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক গভর্নর ছিলেন বাঙালি কূটনীতিক সুলতানউদ্দিন আহমেদ। তিনি দল দুটির মুখ্য নেতাদের কাছে তাদের দলভুক্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নামের তালিকা দাবি করলে তাকে যে তালিকা সরবরাহ করা হয়, তাতে কিছু সদস্যের নাম উভয় দলের তালিকায় দেখে তিনি বিস্মিত হন। তিনি নেতাদের ডেকে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের তার সামনে উপস্থিত করে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ করতে বলেন। উভয় দল এ ধরনের দোদুল্যমান সদস্যদের গভর্নমেন্ট হাউজে নিয়ে তাদের স্বাক্ষর গ্রহণের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে। এ সম্পর্কে গভর্নরের এডিসি মেজর এস জি জিলানি তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘ফিফটিন গভর্নরস আই সার্ভড উইথ: আনটোল্ড স্টোরি অফ ইস্ট পাকিস্তান’ যা লিখেছেন, তা হুবহু উপস্থাপন করছি-

‘একদিন সকালে কেএসপি’র বর্ষীয়ান নেতা ও কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মি: আলীকে সঙ্গে নিয়ে গভর্নমেন্ট হাউজে এসে গভর্নর সুলতানউদ্দিন আহমেদ ও সিনিয়র আমলা পির আহসানউদ্দীনের সামনে বলেন যে মি: আলী কেএসপি’র সদস্য এবং তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের দাবী সত্য নয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে গভর্নর তার পাঠকক্ষে কাজ করছিলেন, আমি দ্রুতবেগে দুটি গাড়ি আসতে দেখি। গাড়ি দুটি পোর্চের নিচে কড়া ব্রেক করে চাকায় শব্দ তুলে থামে।’

‘প্রথম যিনি গাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। তার পেছনে অন্যান্য যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আমি শুধু মি: আলীকে চিনতে পারি, যিনি সকালে গভর্নমেন্ট হাউজে এসেছিলেন। মাথার এলোমেলো চুলে ও লুঙ্গি পরা অবস্থায় তাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও দুই ব্যক্তি তাকে সঙ্গে নিয়ে গভর্নরের পাঠকক্ষে যান, অন্যেরা বাইরে অপেক্ষা করেন। আমার এক সহকর্মী ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে দর্শনার্থীদের মধ্যে কিবরিয়া নামে একজন তাকে বলেন যে মি: আলী সকালে গভর্নমেন্ট হাউজে এসে কেএসপি’র পক্ষে তার সমর্থনসূচক স্বাক্ষর দিয়েছেন বলে জানার পর আওয়ামী লীগ নেতারা ঘন্টা খানেক আগে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পিটিয়েছে, হুমকি দিয়েছে এবং এখন সাথে এনেছে কেএসপি’র প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করানোর জন্য। আমি গভর্নরের পাঠকক্ষে প্রবেশ করার পর মি: আলীকে গভর্নরের কাছে বলতে শুনি যে কেন্দ্রুীয় মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস সকালে তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবরদস্তি করে নিয়ে এসেছিলেন, আসলে তিনি আওয়ামী লীগের লোক এবং এখন তিনি তার ভুল শোধরাতে এসেছেন।’

আওয়ামী লীগ সব সময় ন্যায়ের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, আইনের শাসনের পক্ষে এবং তাদের কৃত যে কোনো কর্মই তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদের এ অধিকার চর্চার এমন ভূরি ভূরি নজীর দেখানো যাবে। তারা অন্যদের তো ছাড়েই না, পেটানোর ও খুন-জখমের জন্য কাউকে সামনে না পেলে নিজেরাই নিজেদের কাটে- যার সুন্দরতম দৃষ্টান্ত ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের সামনে ছাত্রলীগের কিছু নেতার দ্বারা তাদেরই ৭ জনকে গুলি করে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, অর্থাৎ যার কাছ থেকে তারা এসেছিলেন; তার কাছেই ফেরত পাঠিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রথম ও দ্বিতীয় মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আওয়ামী লীগের একাংশের সভাপতি হন। তার নামে ব্রাকেটবন্দী আওয়ামী লীগের হয়ে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের জয়ী হন। এই পর্যন্ত তিনি ভালোই ছিলেন। ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর জাতীয় পার্টি গঠন করার পর তিনি এরশাদের দলে যোগ দেন। এরশাদের ক্ষমতা দখলকে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মিজান চৌধুরীর জাতীয় পার্টিতে যোগদান তাদের গায়ে জ্বালা ধরিয়েছিল। তদুপরি এরশাদের আশীর্বাদে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। জ্বালার ওপর জ্বালা!

এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগের এই সাবেক নেতা ও এরশাদ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ১৯৯১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সাহস করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আর যায় কোথায়! ছাত্রলীগের সুসন্তানরা তাকে টেনেহিঁচড়ে শহীদ মিনারের বেদী থেকে নামায়, কিল-ঘুষি মারে, তার সফেদ পাঞ্জবি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। কিছু লোক তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে এবং তিনি প্রাণ নিয়ে বাঁচেন। আওয়ামী লীগের মতোই দলটির ছাত্র সংগঠনের কেউ কোনো অন্যায় করতেই পারে না। কদাপি নয়। তারা যা কিছু করে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে গবেষণা চালিয়ে তা তাদের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক অধিকার বলেই করে। একমাত্র আওয়ামী লীগেরই এসব করার অধিকার আছে। তাদের সম্পর্কে কে কী ভাবল, এর কোনো তোয়াক্কা তারা কোনোকালে করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না।

ড. ইউনূস আওয়ামী ভাইদের শিকারে পরিণত হোক, অপমান অপদস্ত হোক, অন্যেরাও হোক। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়- এমন সবাই আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে পোকামাকড় তুল্য, বাঙালি জাতির কলঙ্ক, ওদের ডলে-পিষে মেরে ফেললেই বা কি আসে যায়! সবাই তো আর একভাবে ভাবে না। দেশবাসী তাদের চোখের সামনে আওয়ামী লীগকে বারবার চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়-অপরাধ করে, দেশকে উজাড় করার মতো অবস্থায় ফেলেছে। এখন তারা নিজেরাই নিজেদের অপকর্মের শিকারে পরিণত হয়েছে। নিজেদের সৃষ্ট ইতিহাস থেকে তারা কখনও কোনো শিক্ষাগ্রহণ করেনি। না, পঁচাত্তরের শিক্ষা, না চব্বিশের শিক্ষা।

আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের মনের কথা আগাম জানতেন। সেজন্য তিনি কুরআনে বলেছেন, ‘ছুম্মুন বুকমুন উমইউন, ফাহুম লা ইয়ারজিউন,’ অর্থ্যাৎ ‘ওরা মূর্খ, বধির ও অন্ধ। ওরা সত্যের পথে ফিরে আসবে না’ (সুরা বাকারা: ১৮)। তাই এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, আওয়ামী লীগ শিখবে না। সাড়ে ১৫ বছরের বাড়াবাড়ির যে পরিণতি আওয়ামী লীগকে ভোগ করতে হচ্ছে, হত্যাসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলার আসামি হয়ে দলটির শত শত নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের হয় কারাগারে অথবা গ্রেফতার এড়াতে আড়ালে-আবডালে দিন কাটাতে হচ্ছে, তা শোচনীয়। এ কাজগুলো আওয়ামী লীগেরই শেখানো। ক্ষমতার গগন থেকে আওয়ামী লীগের ছিটকে পড়ার এবং বাংলাদেশে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার অধিকারও থেকেও বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। এটা ভাবা যায়? এ পরিস্থিতি তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে। চর্যাপদে আছে- ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।’

যে সময়ে আওয়ামী লীগের উচিত তাদের কৃত অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না বলে মুচলেকা দেওয়া, সেখানে দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড দলটিকে কি খাদের আরও গভীরে ঠেলে দেবে?

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রখ্যাত সাংবাদিক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১৮.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

দুর্গাপূজা: আনন্দ, সম্প্রীতি ও মানবতার উৎসব
১৭ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজা: আনন্দ, সম্প্রীতি ও মানবতার উৎসব

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডেশরৎ এলেই প্রকৃতিতে দেখা দেয় এক সুন্দর পরিবর্তন। নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল আর শ...

দেবীর আরাধনা বনাম ঘরের নারীর অবহেলা
১৭ অক্টোবর ২০২৬

দেবীর আরাধনা বনাম ঘরের নারীর অবহেলা

চিররঞ্জন সরকারহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই এবার দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। জগন্না...

অপ্রতিমের পর তাজমিন এবার কে?
১৬ অক্টোবর ২০২৬

অপ্রতিমের পর তাজমিন এবার কে?

নজরুল ইসলামএকটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের পৃথিবীকে অন্ধকার করে দেয়; আর একের পর এক শিশুহত্যা পুরো সম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই