সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন, কিংবদন্তি অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড (গ্যারি) সোবার্স আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে শুক্রবার (১৭ জুলাই) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই মহান ক্রিকেটার। তাঁর মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
শোকবার্তায় সংস্থাটি লিখেছে, ‘একটি মহান ইনিংসের সমাপ্তি ঘটল। আমাদের হৃদয়ে এখন ও চিরকাল থাকবেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স।’
ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচিত সোবার্স ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা। ব্যাট হাতে যেমন ছিলেন বিধ্বংসী, তেমনি বল হাতে ছিলেন সমান কার্যকর। বাঁহাতি গতিময় বোলিংয়ের পাশাপাশি অর্থোডক্স স্পিন ও রিস্ট স্পিন—সব ধরনের বোলিংয়েই ছিল তাঁর দক্ষতা। অসাধারণ স্লিপ ফিল্ডিং তাঁকে আরো অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। অনেকের মতে, তিনি শুধু সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারই নন, ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।
১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট খেলেন সোবার্স। ২৬টি শতকে ৫৭ দশমিক ৭৮ গড়ে করেন ৮ হাজার ৩২ রান। বল হাতে ৩৪ দশমিক ৩ গড়ে নেন ২৩৫টি উইকেট। এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট শিকার করেন ছয়বার।
পুরুষ ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার তাঁর সম্মানেই **স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি** নামে পরিচিত।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের এক বছর পরই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে অভিষেক হয় তাঁর। ক্যারিয়ারের শুরুতে মূলত বোলার হিসেবে খেললেও পরে ব্যাট হাতে লিখেছেন ইতিহাস। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে স্যাবিনা পার্কে অপরাজিত ৩৬৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে লেন হাটনের ৩৬৪ রানের রেকর্ড ভেঙে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সেই রেকর্ড টিকে ছিল ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। পরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৭৫ রানের ইনিংস খেলে সেটি ভাঙেন আরেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা।
ট্রিপল সেঞ্চুরির পর ব্যাটিংয়ে আরো পরিণত হয়ে ওঠেন সোবার্স। ওই ইনিংসের পর মাত্র ১০ ইনিংসে ছয়টি শতক করেন। ১৯৫৯-৬০ মৌসুমে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আট ইনিংসে ৭০৯ রান করেন ১০১ দশমিক ২৮ গড়ে। একই সিরিজে ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের সঙ্গে গড়েন ৩৯৯ রানের ঐতিহাসিক জুটি। পরবর্তী অস্ট্রেলিয়া সফরেও প্রথম টাই টেস্টে ১৩২ ও সিডনি টেস্টে ১৬৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন।
ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের অবসরের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়কত্ব পান সোবার্স। তিনি ৩৯টি টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দেন এবং সফল অধিনায়ক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগনের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো এক ওভারে ছয় ছক্কার কীর্তি গড়েন তিনি।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বারবাডোজ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে ৩৮৩ ম্যাচে ৫৪ দশমিক ৮৭ গড়ে ২৮ হাজার ৩১৪ রান করেন সোবার্স। তাঁর শতকের সংখ্যা ৮৬। একই সঙ্গে ২৭ দশমিক ৭৪ গড়ে নেন ১ হাজার ৪৩টি উইকেট। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৯৫ ম্যাচে প্রায় তিন হাজার রান ও এক শতাধিক উইকেট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেটের সূচনালগ্নে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে থাকায় এই সংস্করণে তিনি খেলেছেন মাত্র একটি ম্যাচ।
ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৫ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ২০০০ সালে উইজডেন তাঁকে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ভিভ রিচার্ডস ও শেন ওয়ার্নের সঙ্গে শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন হিসেবে নির্বাচিত করে। ২০০৯ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন।
১৯৩৬ সালে বারবাডোজে জন্ম নেওয়া সোবার্স ছয় ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে তাঁর নাবিক বাবা মারা গেলে মায়ের স্নেহেই বড় হয়ে ওঠেন তিনি। জন্মের সময় তাঁর দুই হাতেই ছয়টি করে আঙুল ছিল, পরে অতিরিক্ত আঙুলগুলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়।
ক্রিকেটের পাশাপাশি বাস্কেটবল, ফুটবল ও গলফেও ছিলেন সমান পারদর্শী। তিনটি খেলাতেই তিনি নিজ জন্মভূমি বারবাডোজের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
সানা/আপ্র/১৮/৭/২০২৬