গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

মেনু

ডাকাত আতঙ্কে অশান্ত কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ১৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০১:৫৭ এএম ২০২৬
ডাকাত আতঙ্কে অশান্ত কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বর্ষা মৌসুমে কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা নৌপথ। সেই নৌপথেই এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংঘবদ্ধ নৌ-ডাকাত চক্র। একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় জেলে, ব্যবসায়ী, যাত্রী ও পর্যটকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। সন্ধ্যার পর অনেক নৌযান চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশ, নৌ পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশ যৌথভাবে বিশেষ নৌ-টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে ডাকাতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এবং কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

একের পর এক ডাকাতিতে আতঙ্ক: গত ৭ জুলাই রাতে মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় ৪০ জন পর্যটক ডাকাতদের কবলে পড়েন। অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে মারধর করা হয়। পরে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।

এর পর একই দিন রাত ১০টার দিকে করিমগঞ্জের বালিখোলা ঘাট থেকে মিঠামইনের ঘাগড়াগামী একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও সুইজগেট এলাকায় ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহ বহনকারী ওই ট্রলারে হামলা চালিয়ে তিনটি মোবাইল ফোন, একটি সোলার ব্যাটারি ও নগদ অর্থ নিয়ে যায় ডাকাতরা। মানবিক এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

সবশেষে ৮ জুলাই রাত সাড়ে ৭টার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেয়ারপুর ব্রিজসংলগ্ন বগাডুবি খাল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী ট্রলারে ডাকাতি হয়। দেশীয় অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে হাঁড়ি-পাতিল, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, দুটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৭৪ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা।

কমেছে নৌ চলাচল, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা: স্থানীয়রা জানান, ধারাবাহিক ডাকাতির কারণে সন্ধ্যার পর হাওরে নৌ চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। জেলেরা রাতে মাছ ধরতে ভয় পাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি অনুভব করছেন এবং অনেক পর্যটক হাওর ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ ও নির্জন খালগুলোতে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। হাসানপুর ব্রিজ, কলিরভিটা, কাটাখালি, শিমুলবাগ, ছিলনী ব্রিজ, বড়িবাড়ি, বাদলা সংলগ্ন হাওর এবং অষ্টগ্রাম থেকে বাজিতপুর ও নাসিরনগরগামী নৌপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সন্দেহভাজন ট্রলার ও নৌযানে তল্লাশি, মাঝিদের পরিচয় যাচাই, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও মাঝিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাকাতচক্রের সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ ও আন্তঃজেলা অপরাধচক্র শনাক্তে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের টহলে ফিরছে আস্থা: বিশেষ নৌ-টহল শুরু হওয়ার পর হাওরের মাঝি, জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

ইটনার মাঝি হুমায়ুন মিয়া বলেন, আগে সন্ধ্যা হলেই আতঙ্ক তৈরি হতো। যাত্রীরা রাতে নৌকায় উঠতে ভয় পেতেন। এখন পুলিশের নিয়মিত টহল দেখে কিছুটা সাহস পাচ্ছেন তারা।

মাছ ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম বলেন, রাতে লাখ লাখ টাকার মাছ নিয়ে বাজারে যেতে হয়। ডাকাতির ভয়ে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পুলিশের টহল থাকায় এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে।

পর্যটক রাকিব হাসান বলেন, ডাকাতির খবর শুনে অনেকেই ভ্রমণ বাতিল করেছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আবারও হাওরে পর্যটকদের আগমন বাড়বে।

ইটনা ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী বলেন, কয়েকদিন ধরে চামড়া বন্দর থেকে বিকেল ৫টায় ছেড়ে আসা ইটনাগামী সর্বশেষ ট্রলারটি পুলিশি নিরাপত্তায় রাত ৮টার দিকে ইটনায় পৌঁছাচ্ছে। এতে মাঝিদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরেছে।

তবে তিনি জানান, নিরাপত্তার কারণে রাতে যাত্রীবাহী নৌকা ও ট্রলার চলাচল এখনো বন্ধ রয়েছে।

মাছ আহরণে প্রভাব: হাওরের মাছ ব্যবসায়ী গোপেশ বর্মণ বলেন, ডাকাত আতঙ্কের কারণে জেলেরা আগের মতো গভীর রাত পর্যন্ত মাছ ধরতে পারছেন না। বর্তমানে সর্বোচ্চ রাত ২টা পর্যন্ত মাছ ধরে ফিরে আসছেন তারা। অথচ নিরাপত্তা থাকলে ভোর পর্যন্ত মাছ আহরণ করা সম্ভব হতো।

তার ভাষ্য, নিরাপত্তাহীনতার কারণে মাছ আহরণের পরিমাণ কমে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা আবার প্রায় ৩০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

মিঠামইনের গোপদিঘী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু বলেন, আগে রাতে হাওরে চলাচলে কোনো ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছানোর চিন্তা করতে হয়। দিনের আলোতে ইউনিয়ন পরিষদের মতো ব্যস্ত এলাকায় ডাকাতির ঘটনা আগে কল্পনাও করা যেত না।

নিরাপত্তায় নতুন ব্যবস্থা: মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনোয়ার মোহাম্মদ জানান, প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত হাওরে টহল চলছে। হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা গেলে ডাকাতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ইটনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ খান জানান, প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেওয়া হচ্ছে। পানি কমে গেলে সড়কপথেও অভিযান বাড়ানো হবে।

অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বলেন, থানা পুলিশ, নৌ পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে টহল এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার পর জরুরি প্রয়োজন ছাড়া হাওরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নৌ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি কে এম আরিফুল বলেন, হাওর অঞ্চল সরাসরি নৌ পুলিশের আওতাভুক্ত না হলেও জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ রিজিয়ন টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার মো. নাইমুল হক জানান, বিকেল ৫টার পর যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। তবে জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী ও মরদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে পুলিশি নিরাপত্তায় পারাপারের ব্যবস্থা করা হবে।

বড় ডাকাতির রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি: পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, হাওরের একটি বড় নৌ-ডাকাতির রহস্য ইতোমধ্যে উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জড়িত ডাকাতচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মালামাল ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকেল সাড়ে ৫টার পর হাওরে অবস্থান না করার আহ্বান জানান তিনি।

ডাকাতদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা: কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে হাওরবাসীকেও ডাকাত প্রতিরোধে সংগঠিত হতে হবে।

তিনি বলেন, ডাকাতদের তালিকা রয়েছে। অপরাধ ছেড়ে না দিলে হাওরে তাদের কোনো জায়গা হবে না, জায়গা হবে কারাগারে।

তিনি ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন থানার জন্য তিনটি দ্রুতগতির নৌযান বরাদ্দের দাবি জানিয়ে বলেন, হাওরে আসা মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, হাওরাঞ্চলে ডাকাতি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকা রয়েছে। ধারাবাহিক অভিযান চালালে তারা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে।

হাওরবাসীর প্রত্যাশা, বিশেষ নৌ-টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সমন্বিত অভিযান পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে অব্যাহত থাকলে নৌপথে মানুষের আস্থা ফিরবে। একই সঙ্গে মৎস্য খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন ও পর্যটনও স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে।
সানা/আপ্র/১৮/৭/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

কাস্টমস সার্ভারে অনুপ্রবেশ, বিমানবন্দরে যুবক গ্রেফতার
১৮ জুলাই ২০২৬

কাস্টমস সার্ভারে অনুপ্রবেশ, বিমানবন্দরে যুবক গ্রেফতার

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস সার্ভারে অবৈধভাবে প্রবেশ করে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বিদেশি মদ...

আগামী তিন বছরে সব কৃষক পাবেন ‘কৃষক কার্ড’
১৮ জুলাই ২০২৬

আগামী তিন বছরে সব কৃষক পাবেন ‘কৃষক কার্ড’

দেশের প্রায় আড়াই কোটি থেকে ২ কোটি ৭০ লাখ কৃষককে আগামী তিন বছরের মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আ...

বন্যাদুর্গতদের পাশে সরকার, পুনর্বাসনে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
১৭ জুলাই ২০২৬

বন্যাদুর্গতদের পাশে সরকার, পুনর্বাসনে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন...

‘আপনার আগেই ছাত্রদল করেছি’, এসপির বক্তব্যে বিতর্ক
১৭ জুলাই ২০২৬

‘আপনার আগেই ছাত্রদল করেছি’, এসপির বক্তব্যে বিতর্ক

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামানের সঙ্গে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠুর বা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই