একটি উইকেট চাই, শুধু একটি উইকেট। সকাল থেকেই ছিল কাতর অপেক্ষা। জুটি ভাঙার সেই উইকেটই ধরা দিচ্ছিল না। বাড়ছিল রান, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল শঙ্কা। যদিও মাত্র একটি ঘণ্টাই পেরিয়েছে, তবু মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল! শেষ পর্যন্ত জুটি ভাঙার সেই উইকেট যখন ধরা দিলো, বাকি দুটিও পড়ে গেল টপাটপ। যেন দীর্ঘ খরার পর প্রবল বর্ষণ!
বর্ষণই বটে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন ঝরছে সাফল্যের বাদলধারা। চলছে সেই বরিষায় আনন্দ অবগাহন। সিলেটও স্বাক্ষী রইল সেই গৌরবের। শেষ দিনে ৭৮ রানের জয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেই ছাড়ল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
এই নিয়ে টানা দুটি টেস্ট সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়েও ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার দেশের মাঠে ধরা দিলো একই সাফল্য। তবে এবারের কৃতিত্ব একটু আলাদাও।
সেবার দুটি টেস্টেই বাংলাদেশ টস জিতেছিল। এবার দুই টেস্টেই টস হেরে সবুজ উইকেটে আগে ব্যাট করতে হয়েছে। সব চ্যালেঞ্জ জিতেই ধরা দিয়েছে সিরিজ জয়ের স্বাদ।
জয়ের মঞ্চ সাজানো হয়ে গিয়েছিল আগের দিনই। শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান, বাংলাদেশের ৩ উইকেট। দিনের প্রথম ঘণ্টায় মোহাম্মাদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান দ্রুত রান তুলে কিছুটা ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন বটে। তবে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত জিতেছে দাপটেই। এই জুটি ভাঙার পর আর কোনো রান ছাড়াই গুটিয়ে গেছে পাকিস্তানের ইনিংস।
আগের দিন ৪ উইকেট শিকারি তাইজুল ইসলাম শেষ দিনেরও নায়ক। বাংলাদেশের মাথাব্যথা হয়ে ওঠা জুটি ভেঙেছেন তিনি। তার হাত ধরেই এসেছে জয় নিশ্চিত করা উইকেট। দেশের সফলতম টেস্ট বোলারের প্রাপ্তি ইনিংসে ৬ উইকেট আর ম্যাচে ৯টি।
এ দিন সকাল থেকে সিলেটের আকাশ ছিল গোমড়া। থেমে থেমে ঝরছিল বৃষ্টি। তবে খেলায় বাগড়া খুব বেশি পড়েনি। ১৫ মিনিট দেরিতে শুরু হয় খেলা। নাহিদ রানার প্রথম ওভারেই আসে সুযোগ। গালিতে রিজওয়ানের ক্যাচ একটুর জন্য মুঠোয় জমাতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজ।
এরপর থেকে কেবল যন্ত্রণাই বাড়ছিল। বেশ কয়েকবার অল্পের জন্য ব্যাটের কানায় লাগেনি বল। ক্যাচ পড়েছে দুই ফিল্ডারের মাঝে। দারুণ কিছু শটও খেলেছেন রিজওয়ান ও সাজিদ খান। ব্যবধান নেমে গেছে একশর নিচে। একটু পর আশির নিচে। বোলারদের কোনো প্রচেষ্টা, অধিনায়কের নানা কৌশল কাজে দিচ্ছিল না।
আশীর্বাদ হয়ে আসে তখন পানি পানের বিরতি। বিরতির পর দ্বিতীয় বলেই জুটি ভাঙেন তাইজুল। স্লিপে ধরা পড়েন সাজিদ (২৮)। জুটি থামে ৫৪ রানে।
পাকিস্তানের ইনিংসও থমকে যায় সেখানেই। শরিফুল আক্রমণে এসে প্রথম বলেই বিদায় করেন ৯৪ রান করা রিজওয়ানকে। শেষ উইকেটও দ্রুতই নিয়ে নেন তাইজুল।
১৩ বলের মধ্যে শূন্য রানেই পতন শেষ তিন উইকেটের। জয়ের পর বাংলাদেশ দল উল্লাস করল বটে। তবে খুব বাঁধনহারা আনন্দ দেখা গেল না। যেন তারা বোঝাতে চাইলেন, এ আর এমন কী!
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৭৮।
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ২৩২। বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৯০।
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ (লক্ষ্য ৪৩৭, আগের দিন ৩১৬/৭) (রিজওয়ান ৯৪, সাজিদ ২৮, খুররাম ০, আব্বাস ০*; তাসকিন ১২-১-৬২-০, শরিফুল ১২-৪-২৯-১, নাহিদ ১৮-৩-৭১-২, মিরাজ ২০-১-৬২-১, তাইজুল ৩৪.২-৪-১২০-৬, মুমিনুল ১-০-৩-০)
ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী। সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধান জয়ী। ম্যান অব দা ম্যাচ: লিটন কুমার দাস। ম্যান অব দা সিরিজ: মুশফিকুর রহিম।
এখন পর্যন্ত এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন: পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চারটি টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে তাদের ঘরের মাঠে দুটি, এবার নিজেদের ঘরের মাঠে বাকি দুটি- যাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মন্তব্য করেছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
মিরপুরে ১০৪ রানের জয়ের পর সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টেও ৭৮ রানের জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। পঞ্চম দিনে এই জয়ের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস গড়ে টাইগাররা। প্রথমবারের মতো টানা চারটি টেস্ট সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে।
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর শান্ত বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।’ তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরো বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবে বলেও বিশ্বাস অধিনায়কের, ‘আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরো অনেক টেস্ট ম্যাচ খেলবে এবং আশা করি আরো বড় অর্জন আসবে। সব মিলিয়ে এই চারটি ম্যাচ আমাদের জন্য খুবই বিশেষ ছিল এবং আমরা দারুণ ক্রিকেট খেলেছি। তবে আমি সবসময়ই বলি, আমাদের ধীরে ধীরে এই টেস্ট দলকে গড়ে তুলতে হবে।’
দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে ধারাবাহিক শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে এখনও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার মতে, ‘এখনও অনেক জায়গায় আমাদের উন্নতি করতে হবে এবং সেগুলো ঠিকভাবে সমাধান করতে হবে। যখন আমরা ঘরের মাঠে ও বিদেশে নিয়মিত ভালো খেলতে পারবো, তখনই আমি বলবো এই দল আগের চেয়ে সত্যিকারের আরো ভালো হয়েছে।’ শুরুর ঘণ্টাতে রিজওয়ান তার ব্যাটিংয়ে রোমাঞ্চ ছড়াচ্ছিলেন। তার লড়াই দেখে দুশ্চিন্তাতে পড়েছিল বাংলাদেশ। শান্তর ভাষায়, ‘ওই এক ঘণ্টার আবেগ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সত্যি বলতে, ওরা ভালো ব্যাটিং করছিল। আমরা একটু চাপেও ছিলাম। তবে একটা ব্যাপার বলবো যে, আগের টেস্ট ম্যাচগুলো থেকে আস্তে আস্তে এখন ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, প্যানিক না করা, এসব আরো ভালো হয়েছে। যদিও ওখানে আরো উন্নতির জায়গা আছে, বড় দলগুলি এখানে আরো ধীরস্থির থাকে। তবে আগের চেয়ে আরো উন্নতি হওয়ায় অধিনায়ক হিসেবে আমি খুশি।’
সানা/আপ্র/২০/৫/২০২৬