দিনের খেলা তখন শেষ হওয়ার অপেক্ষা। বাকি স্রেফ তিনটি ডেলিভারি। কিন্তু মুমিনুল পারলেন না পার করতে। খুররাম শাহজাদের লেংথ থেকে লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারিতে ধরা পড়লেন তিনি উইকেটের পেছনে।
পাকিস্তানিরা মেতে উঠলেন উল্লাসে। মুমিনুল মাথা নিচু করে হাঁটা দিলেন ড্রেসিং রুমের পথে। তার সঙ্গী তখন নাজমুল হোসেন শান্তও। এই আউটের সঙ্গে দিনের খেলাও শেষ! তবে এই দৃশ্যটায় ফুটে উঠছে না গোটা দিনের ছবি। শেষবেলায় উইকেট হারানোর অস্বস্তি থাকলেও দিনটি ছিল বাংলাদেশেরই।
সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে পাকিস্তানের চেয়ে ১৫৬ রানে এগিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। উইকেট আছে ৭টি। আগের দিন লিটন কুমার দাসের অসাধারণ শতরানে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তুলেছিল ২৭৮ রান। পাকিস্তান রোববার গুটিয়ে যায় ২৩২ রানে। চোট কাটিয়ে ফেরা বাবর আজমের ব্যাট থেকে আসে ফিফটি।
বাবরের উইকেটসহ তিনটি শিকার ধরেন নাহিদ রানা। তিন উইকেট নেন তাইজুল ইসলামও, দুটি করে তাসকিন ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ দিন শেষ করে ৩ উইকেটে ১১০ রান নিয়ে। ফিফটি করে আউট হন মাহমুদুল হাসান জয়। প্রথম দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে লিটন বলেছিলেন, দ্বিতীয় সকালে আকাশ যদি একটু মেঘলা থাকে এবং প্রথম ১০ ওভারে যদি দুটি উইকেট নেওয়া যায়, তাহলে লিড নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে দলের। তার সেই চাওয়ার সঙ্গে পাওয়া মিলে গেছে দারুণভাবে।
সকালে পাকিস্তানের দুই ওপেনারকে দ্রুতই ফেরান তাসকিন আহমেদ। বাকি বোলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ধরা দেয় লিড। কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান নিয়ে দিন শুরু করে পাকিস্তান।
আকাশ ছিল কিছুটা মেঘলা, উইকেটে ছিল প্রাণ। সেখানে পাকিস্তানের দুই ব্যাটসম্যানকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেন শরিফুল ইসলাম, আরেক প্রান্তে নিজের প্রথম দুই ওভারে দুটি উইকেট নেন তাসকিন।
আগের টেস্টে জোড়া ফিফটি করা আব্দুল্লাহ ফাজাল (৯) আউট হন উইকেটের পেছনে লিটন দাসের দুর্দান্ত ক্যাচে। আগের টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান আজান আওয়াইস ব্যাটে-প্যাড ক্যাচে বিদায় নেন ১৩ রানে।
তাসকিন তৃতীয় ওভারটি করতে এসেই হাঁপাচ্ছিলেন।
তার বদলে বোলিংয়ে এসে নাহিদ রানাও একটু ছিলেন এলামেলো। এই সুযোগে বাবর আজম ও শান মাসুদ দ্রুত কিছু বাউন্ডারি আদায় করে নেন। স্পিন আক্রমণে আনতেই ভাঙে এই জুটি। মেহেদী হাসান মিরাজের দ্বিতীয় বলেই শান মাসুদ (২৬ বলে ২১) ধরা পড়েন শর্ট কাভারে। পরের ব্যাটসম্যান সাউদ শাকিলকে একদম ক্রিজে আটকে রেখেছিলেন মিরাজ।
সেই শেকল ভাঙার চেষ্টায় সুইপ শট ডেকে আনে তার পতন (২৮ বলে ৮)। ৪ উইকেট নিয়ে তখন দারুণ উজ্জীবিত বাংলাদেশ। তবে বাবর শুরু থেকেই ছিলেন সাবলিল। তাকে যথেষ্ট ভালো বোলিং করতেও পারছিলেন না পেসাররা। দৃষ্টিনন্দন কিছু বাউন্ডারি আসে তার ব্যাট থেকে।
সালমান আলি আগার সঙ্গে ভালো জুটিও গড়ে ওঠে। লাঞ্চের পর বাবর ফিফটিতে পা রাখেন ৬৩ বলে। জুটি ভাঙতে নাহিদকে আক্রমণে ফেরান বাংলাদেশ অধিনায়ক। ফল পেয়ে যান হাতেনাতেই।
দারুণ খেলতে থাকা বাবর আলতো ফ্লিকে বল তুলে দেন মিড অনে মুশফিকের হাতে। এরপর উইকেট ধরা দিতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। তাইজুল ইসলামকে উইকেট উপহার দিয়ে ফেরেন সালমান (২১)। এই বাঁহাতি স্পিনারের দারুণ ড্রিফট বুঝতে না পেরে বোল্ড হয়ে যান মোহাম্মাদ রিজওয়ান (১৩)। তাইজুলকে ওড়াতে গিয়েই থমকে যান হাসান আলি (১৮)।
বাংলাদেশ তখন ৭০-৮০ রানের লিড পাবে বলেই মনে হচ্ছিল। তবে ১৮৪ রানে অষ্টম উইকেট হারানো পাকিস্তান শেষ দুই জুটিতে যোগ করে ৪৮ রান। খুররাম শাহজাদ একটি ছক্কা ও চার মারার পর আউট হয়ে যান নাহিদ রানার বাউন্সারে।
সাজিদ খান এরপর ব্যবধান কমান তাইজুলকে টানা তিনটি ছক্কা মেরে। চার ছক্কায় ২৮ বলে ৩৮ রানের ইনিংস খেলে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন তিনি নাহিদের বলেই তানজিদ হাসানের দারুণ ক্যাচে। শেষ জুটিতে আসে ২৫ রান, সব রানই করেন সাজিদ। বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামার পর চতুর্থ ওভারে হারায় অভিষিক্ত ওপেনার তানজিদ হাসানকে। তবে সেই ধাক্কা বুঝতে দেননি মাহমুদুল হাসান জয়। স্কয়ার কাট, কাভার ড্রাইভ, ফ্লিক, দারুণ সব শটে বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি আসতে থাকে তার ব্যাট থেকে।
১০ চারে ফিফটি করে ফেলেন তিনি ৫৮ বলেই। তবে সম্ভাবনাময় ইনিংসটিকে বড় করতে পারেননি তিনি। ৫২ রানে তার বিদায়ে জুটি থামে ৭৬ রানে। নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক এরপর দিনটা পার করে দেওয়ার পথেই ছিলেন। কিন্তু শেষ সময়ে বিপত্তি। মুমিনুল ফেরেন ৩০ রানে। তৃতীয় দিনে এখন লিড আরও বাড়িয়ে পাকিস্তানের নাগালের বাইরে নেওয়ার অপেক্ষা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৭৮
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: (আগের দিন ২১/০) ৫৭.৪ ওভারে ২৩২ (আজান ১৩, ফাজাল ৯, মাসুদ ২১, বাবর ৬৮, শাকিল ৮, সালমান ২১, রিজওয়ান ১৩, হাসান ১৮, সাজিদ ৩৮, শাহজাদ ১০, আব্বাস ০*; তাসকিন ১১-১-৩৭-২, শরিফুল ১১-৩-৩৯-০, মিরাজ ৯-৩-২১-২, নাহিদ ১২.৪-১-৬০-৩, তাইজুল ১৪-৪-৬৭-৩)
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ২৬.৪ ওভারে ১১০/৩ (জয় ৫২, তানজিদ ৪, মুমিনুল ৩০, শান্ত ১৩*; আব্বাস ৮-০-২৯-১, শাহজাদ ৫.৪-২-১৯-২, হাসান ৫-১-১৮-০, সাজিদ ৮-১-৩৬-০)
ডিসি/আপ্র/১৭/০৫/২০২৬