মাহমুদ আহমদ
প্রত্যেকের জীবনে অন্তরের প্রশান্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের দুনিয়াবি ও ধর্মীয় দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালনের জন্য তার মানসিক সুস্থতা ও প্রশান্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইসলাম মানুষের জন্য কতগুলো ঐশী বিধান জারি করেছে, যেগুলো পালনের মাধ্যমে মানুষ এ পার্থিব দুনিয়াতেই জান্নাতের স্বাদ উপভোগ করার সৌভাগ্য লাভ করে।
ইমানদার ব্যক্তি সৎকর্মের বিনিময়ে কেবল পরকালেই পুরস্কৃত হবেন, তা নয়; দুনিয়াতেও আনন্দময় ও পবিত্র জীবন লাভ করবেন। আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ইমানদার পুরুষ হোক কিংবা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)।
মানুষ সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও দুর্ভাবনাহীন জীবন লাভ করতে পারে। ইসলামি রীতি মানসিক প্রশান্তি, আত্মার সুস্থতা, স্থিরতা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য আধ্যাত্মিক শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এসব কিছুই অর্জন করা সম্ভব কেবল সৎকর্মের মাধ্যমে। মানুষের ভেতর ও বাইর যদি স্বচ্ছ ও সৎ হয়, তাহলে তার জীবন হবে প্রশান্তিময়।
একজন সৎ ও মুমিন ব্যক্তি আর্থিক অভাব-অনটন কিংবা কষ্টে পতিত হলেও কখনো উদ্বিগ্ন হন না; বরং আল্লাহপাকের ওপর ভরসা করেন। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩।
আমাদের প্রতিটি কর্মই আল্লাহপাক দেখছেন এবং তাঁর কাছে আমাদের হিসাবও দিতে হবে। তাই কাজগুলো যদি পবিত্র ও সৎ হয়, তাহলে হিসাব হবে সহজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আকাশসমূহে এবং পৃথিবীতে যা আছে, সবই আল্লাহর। আর তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা তোমরা প্রকাশ কর বা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে এর হিসাব নেবেন। অতএব, তিনি যাকে চাইবেন ক্ষমা করবেন এবং যাকে চাইবেন আজাব দেবেন। আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে সর্বশক্তিমান’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৪)।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মানুষের প্রত্যেক কাজেরই হিসাব দিতে হবে, তা যতই গোপন হোক কিংবা প্রকাশ্য। আর এর জন্য পুরস্কার, শাস্তি বা ক্ষমা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী পেতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘যে সৎকর্ম করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কর্ম করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না’ (সুরা হা-মিম সাজদা, আয়াত: ৪৬)।
রোজ হাশরে আল্লাহতাআলা মানুষের পাপ-পুণ্যের ফয়সালা করবেন এবং প্রত্যেকের দুনিয়ার আমল-আখলাক ও কর্মফল অনুযায়ী নিখুঁত নিক্তিতে বিচার করবেন। যারা অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতি ও অসৎকর্মে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে এবং পাপাচারে লিপ্ত থাকবে, প্রতিফলস্বরূপ তিনি তাদের কঠিন শাস্তির ভয়াবহ কষ্টে নিপতিত করবেন। আর যারা সৎকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করবে এবং ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী ইহকালীন জীবন অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাদের সুখ-শান্তিময় বেহেশত প্রদান করবেন। শুধু তা-ই নয়, সেসব নেক আমলকারীকে সম্মানজনক পুরস্কারও প্রদান করবেন। সৎকর্মশীলদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আল্লাহতাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে; তাদের জন্য আছে নিয়ামতে ভরা জান্নাত। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ৮-৯)।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা আরও ঘোষণা করেছেন, ‘আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে। আজ কারও প্রতি জুলুম করা হবে না। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর’ (সুরা আল-মুমিন, আয়াত: ১৭)।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকের মর্যাদা তার কর্মানুযায়ী। এটা এ জন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কৃতকর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না’ (সুরা আল-আহকাফ, আয়াত: ১৯)।
আবার বলা হয়েছে, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে’ (সুরা আজ-জিলজাল, আয়াত: ৭-৮)।
এ জন্য মানবজাতিকে অপকর্ম প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখে, তাহলে সে যেন তার শক্তি দ্বারা তা প্রতিহত করে। যদি সে এতে অক্ষম হয়, তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে। যদি সে এতেও অপারগ হয়, তবে সে অন্তর দ্বারা ঘৃণা পোষণ করবে’ (মুসলিম)।
আমাদের উচিত আখিরাতের পাথেয় অর্জন করা। হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, ‘দুনিয়া পৃষ্ঠপ্রদর্শন করছে আর আখিরাত সম্মুখে আসছে। আর এ দুটির প্রত্যেকটির সন্তানাদি রয়েছে। তবে তোমরা আখিরাতের সন্তান হও, দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কেননা, এখন আমলের সময়, এখানে কোনো হিসাব নেই। আর আগামীকাল হিসাব-নিকাশ হবে, সেখানে আমল করার কোনো সুযোগ নেই’ (বুখারি)।
আমরা যদি ভাবি, এই দুনিয়া আনন্দ-ফুর্তির জায়গা, যখন যা ইচ্ছা করব, আমাকে কে ধরবে? তাহলে একটি কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আর তা হচ্ছে, এই দুনিয়া একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। আমরা সবাই পরীক্ষা দিচ্ছি। যে ভালো পরীক্ষা দেবে, সে ভালো ফল লাভ করবে- এটাই স্বাভাবিক। সেদিন কেউ বলতে পারবে না, ‘হায়! আমি যদি আবার দুনিয়াতে যেতে পারতাম, তাহলে ভালো কাজ করে আসতাম।’ আমরা যা-ই করি না কেন, আল্লাহ তা জানেন ও দেখেন। আল্লাহতায়ালার সামনে আমাদের উপস্থিত হতেই হবে এবং প্রত্যেক কর্মের হিসাব দিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘আর তারা সবাই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। তখন দুর্বল লোকেরা অহংকারীদের বলবে, নিশ্চয় আমরা তোমাদেরই অনুসারী ছিলাম। অতএব, তোমরা আমাদের আজাবের কিছুটাও কি দূর করতে পার? তারা বলবে, আল্লাহ যদি আমাদের হেদায়েত দিতেন, তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদের হেদায়েত দিতাম। আমাদের জন্য এখন বিলাপ করা বা ধৈর্য ধারণ করা উভয়ই সমান’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ২১)।
আমাদের যেদিন আল্লাহপাকের সামনে উপস্থিত করা হবে, সেদিন কেউ কারও বোঝা বহন করার সুযোগ পাবে না। প্রত্যেককে নিজের হিসাব নিজেকেই দিতে হবে। তাই আসুন, আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনা করি। আল্লাহপাক আমাদের ওই তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ
কেএমএএ/আপ্র/২৩.১০.২০২৬