সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে রোববার (১২ জুলাই) ভোরে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, রোববার ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী সমাজ ও সংসদীয় মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
প্রথা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণেই হবে তার শেষ শয্যা। রোববার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে প্রথম জানাজা শেষে বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে সংসদের নির্ধারিত চত্বরে তাকে দাফন করা হবে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন: দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, আইন অঙ্গন ও জাতীয় রাজনীতিতে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।
২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী তিনি ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের আমলে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদি সরকারে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
আইন অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র: ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার বর্তমান পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তার বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। পরে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতায় পরিণত হন।
১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পঞ্চগড়-১ এবং ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ে তার ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন, জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। নিজ জেলা পঞ্চগড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট।
রাষ্ট্রপতির শোক: সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার বিকাশে জমির উদ্দিন সরকারের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার প্রয়াণ দেশের রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রধানমন্ত্রীর শোক: ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির একজন প্রজ্ঞাবান, অভিজ্ঞ, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তার অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আদর্শে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজীবন অবিচল ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নিজের আদর্শকে সমুন্নত রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক ও দেশপ্রেমিককে হারিয়েছে। তার কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সংসদে স্মরণ: জাতীয় সংসদে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে সততা, প্রজ্ঞা, শিষ্টাচার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তার মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা তাকে সফল আইনজীবী, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, সজ্জন রাজনীতিক ও দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার সততা ও পেশাগত সুনামের অনন্য উদাহরণ ছিলেন। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কঠিন রাজনৈতিক সময়ে অনেক নেতাকর্মীর আইনি সহায়তায় তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন। আদালতে লড়াই করেছেন, কিন্তু কখনো পারিশ্রমিক নেননি।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নিজের মেধা ও যোগ্যতায় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে পৌঁছেছিলেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, জাতি একজন মহান রাজনীতিক ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন।
শোক প্রস্তাবের আলোচনায় বিএনপির এ এম মাহাবুব উদ্দিন খোকন, জাতীয় নাগরিক পার্টির আখতার হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর নাজিবুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা অংশ নেন। পরে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
ব্যক্তিজীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মারা যান। তিনি এক মেয়ে নিলোুফার জমির এবং দুই ছেলে নওশাদ জমির ও নওফেল জমির রেখে গেছেন। নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য।
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬