সোমবার (২৫ মে) রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির মধ্যেই আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের দিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, ঈদের দিন রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এসব অঞ্চলে সারাদিন আকাশ মেঘলা থাকতে পারে এবং বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকবে। তবে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আরো কম থাকতে পারে।
ঢাকার আবহাওয়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২৭ তারিখ রাতে বৃষ্টি হতে পারে। ঈদের দিন অর্থাৎ ২৮ তারিখ সকালে রাজধানীতে সামান্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ২৯ তারিখের দিকে আবার বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, দেশের আট বিভাগের মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেটের অনেক জায়গায়; ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশালের দু–এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেটে কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও পটুয়াখালীসহ খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে ফেনীতে সর্বোচ্চ ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং ঢাকায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
নদীবন্দরগুলোতে সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এসব অঞ্চলের নদীবন্দরকে দুই নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এসব এলাকার নদীবন্দরকে এক নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে ঢাকায় ঝুম বৃষ্টিতে ঈদযাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। সকাল থেকে বেলা পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জনজীবনে অস্বস্তি দেখা দেয়। গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও কমলাপুর এলাকায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ভোগান্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেক যাত্রীকে শিশু ও মালপত্রসহ ভিজে গন্তব্যের পথে রওনা হতে হয়েছে।
নিউমার্কেট এলাকায় জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ: রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে এলাকাজুড়ে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিক্রিও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। দুপুরের বৃষ্টির পর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর কবরস্থানমুখী সড়ক পর্যন্ত এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
সোমবার (২৫ মে) মধ্যদুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের সামনে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আটকে পড়ে। অনেক যানবাহনের ইঞ্জিন পানিতে নষ্ট হয়ে সড়কের মাঝেই থেমে যায়।
পথচারীরা জানান, সড়কে পানি জমে থাকায় চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচল নিয়ে চালকদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যায়।
নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের বিক্রির আশা থাকলেও এক বেলার ভারী বৃষ্টিতেই পুরো দিনের ব্যবসা নষ্ট হয়ে গেছে। ক্রেতা না আসায় দোকান খুলে রাখা নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে নিউমার্কেটের প্রধান ফটক থেকে নীলক্ষেত ও আজিমপুর অভিমুখী সড়ক প্রায় নদীর মতো পানিতে ডুবে গেছে। যানবাহন চলাচলের সময় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
জলাবদ্ধতার সুযোগে কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক পথচারীদের পারাপারে ভাড়া আদায় করতে দেখা যায়।
আজিমপুর এলাকায় বাসের অপেক্ষায় থাকা পোশাককর্মী রহিম মিয়া বলেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেও জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন। নতুন পোশাক পরে বের হলেও নোংরা পানির কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরই অল্প বৃষ্টিতে এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে কাজ হলেও বাস্তবে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
তিনি আরো বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক এলাকার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, যা নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও বাস্তবে জলাবদ্ধতার সমস্যা কমেনি। ফলে স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ঈদ উপলক্ষে ছুটি শুরু হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকলেও বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশন এলাকায় যাত্রীচাপ ছিল বেশি। বৃষ্টির কারণে বাস ছাড়তে দেরি হওয়ায় এবং যানজট তৈরি হওয়ায় ভোগান্তি আরো বাড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তাই ঈদযাত্রায় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৫/৫/২০২৬