গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর, শেষ হয়নি বেদনা ও বিচার

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০১:২২ পিএম, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০৭:১২ এএম ২০২৬
রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর, শেষ হয়নি বেদনা ও বিচার
ছবি

ফাইল ছবি

সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও থামেনি বেদনা, মেলেনি বিচার। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দে ধসে পড়ে নয়তলা রানা প্লাজা ভবন। এতে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৫ জন শ্রমিক এবং আহত হন ২ হাজার ৪৩৮ জন। ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা—অনেকে পঙ্গুত্ব ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন, আবার অনেকের জীবন থেমে আছে সেই দিনের ধ্বংসস্তূপেই।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত রানা প্লাজার প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান, দ্বিতীয় তলায় দোকান ও ব্যাংকের শাখা। তৃতীয় থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত ছিল কয়েকটি পোশাক কারখানা—নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যানটম টেক্স লিমিটেড ও ইথারটেক্স লিমিটেড। অষ্টম ও নবম তলা ছিল ফাঁকা। ঘটনার দিন সকালে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক কর্মস্থলে যোগ দেন। সকাল ৮টা থেকেই কাজ শুরু হয়, আর দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা।

ধসের আগের দিন ভবনের চার ও পাঁচ তলার কয়েকটি পিলারে ফাটল দেখা দিলে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাইরে নেমে আসেন। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে ফাটলকে গুরুতর মনে না করে শ্রমিকদের কাজে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন মালিকপক্ষের চাপে শ্রমিকদের আবার ভবনে ঢোকানো হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ধসে পড়ে পুরো ভবন। ভুক্তভোগী শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

ধসের পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র‌্যাব ও পুলিশ যোগ দেয়। টানা ১৭ দিন ধরে চলে উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় জীবিত, আহত ও মৃতদেহ। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং নিহতদের মরদেহ সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়। সাইরেনের শব্দ শুনলেই স্বজনরা ছুটে আসতেন—স্বজনের মরদেহ পাওয়ার আশায়। সেই মাঠ আজও বহন করে শোক আর আর্তনাদের স্মৃতি।

ধসে আহত হওয়া বহু শ্রমিক এখনও শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন। চারতলার শ্রমিক মনোয়ারা বেগম জানান, ধসের সময় ধুলায় অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করা হয়। মাথা, বুক ও কোমরে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় এখন আর ভারী কাজ করতে পারেন না। অন্যদিকে পঞ্চম তলার শ্রমিক জেসমিন আক্তার বলেন, মাথায় আঘাতের কারণে তার মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছে, ফুসফুসের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মেরুদণ্ডে আঘাত লেগেছে। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করাতে পারছেন না। নিখোঁজ স্বামী ও সন্তান নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে তার। অর্ধাহারে-অনাহারে জীবনযাপনই এখন তার বাস্তবতা।

ধসের ঘটনায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়—অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের মামলা, ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মামলা এবং দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা। কিন্তু ১৩ বছরেও কোনো মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। কিছু মামলা এখনও বিচারাধীন, আবার একটি মামলা দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতে স্থগিত ছিল। ফলে হাজারো শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় এখনও বিচার পাননি ভুক্তভোগীরা।

ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলার পর জায়গাটি কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা হলেও সময়ের সঙ্গে তা পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত জমিতে। সেখানে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শহীদ বেদি ‘প্রতিবাদ-প্রতিরোধ’ এখন শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতীক। প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল এলে সেখানে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হয়।

শ্রমিকনেতারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা এখনও নিশ্চিত হয়নি। অনেকেই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত। তাদের দাবি, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আহতদের আজীবন চিকিৎসা, এককালীন আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ এবং রানা প্লাজার স্থানে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। একইসঙ্গে ২৪ এপ্রিলকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পরও স্পষ্ট—এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি বিচারহীনতা, অবহেলা এবং শ্রমিক জীবনের অবমূল্যায়নের এক নির্মম প্রতীক। আজও সেই দিনের আর্তনাদ, স্বজনহারা মানুষের কান্না এবং আহতদের দীর্ঘশ্বাস স্মরণ করিয়ে দেয়—এই বেদনার অধ্যায় এখনও শেষ হয়নি।
সানা/আপ্র/২৪/৪/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে নিন্দার ঝড়, প্রত্যাহার ও অপসারণ দাবি
২৬ অক্টোবর ২০২৬

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে নিন্দার ঝড়, প্রত্যাহার ও অপসারণ দাবি

সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া...

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে তুলকালাম, ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদরদপ্তর
২৬ অক্টোবর ২০২৬

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে তুলকালাম, ব্যাখ্যা দিলো পুলিশ সদরদপ্তর

সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো...

প্রযুক্তি নগরী গড়া ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
২৬ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তি নগরী গড়া ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপানের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী’ প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্...

সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের পরিবারের বিরুদ্ধে ২ মামলা
২৬ অক্টোবর ২০২৬

সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের পরিবারের বিরুদ্ধে ২ মামলা

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম এবং তার পরিবারের সদ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে