বিশ্বের ১৭৬ দেশে দেড় কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথা জানান।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের অষ্টম দিন সভাপতিত্ব করেন স্পিকার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১ দশমিক ৫ কোটির অধিক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এসব বাংলাদেশির মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে প্রবাসীদের কল্যাণমূলক বিষয়টি চরমভাবে অবহেলিত ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের কল্যাণে নানামুখী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
রেমিটেন্স যোদ্ধাদের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ
১) প্রবাসী কর্মীদের প্রশাসনিক, আইনগত এবং কল্যাণমূলক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২৭টি দেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহের বিদ্যমান ৩০টি শ্রম কল্যাণ উইংয়ের বিভিন্ন খাতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড হতে প্রতি অর্থবছরে অর্থ বরাদ্দসহ সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করা হয়;
২) প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আদায় এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনগত সহায়তা প্রদানের আইন সহকারীর মাধ্যমে আইনি সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এ সেবা নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে ১১ মিশনের শ্রম কল্যাণ ল’ ফার্ম বা প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে;
৩) পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতায় কর্মীর দেশে আসতে সমস্যা হলে দূতাবাস বা হাইকমিশন হতে ট্রাভেল পাশের ব্যবস্থা গ্রহণ;
৪) শ্রম কল্যাণ উইং কর্তৃক সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন জেলখানা, ডিটেনশন সেন্টার বা ক্যাম্প পরিদর্শন করে আটক কর্মীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান এবং কারামুক্তির ব্যবস্থা গ্রহণ;
৫) কর্মীর কর্মস্থল পরিদর্শন করে নিয়োগকর্তার সাথে তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং প্রাপ্য মজুরিসহ অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ;
৬) কর্মীর আবাসস্থল পরিদর্শন করে বাসস্থান সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ;
৭) বিপদগ্রস্ত নারী কর্মীদের তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে দেশে ফেরত আনয়ন;
৮) নারী কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে সেইফ হোম স্থাপন ও পরিচালনা;
৯) নিয়মিতভাবে হাসপাতাল পরিদর্শন করে আহত ও অসুস্থ কর্মীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ;
১০) সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম ও আইন কানুন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহর অথবা লেবার ক্যাম্পে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন;
১১) কর্মীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ যেমন- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান;
১২) বাহরাইনে প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মীর সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে বাহরাইনস্থ বাংলাদেশ স্কুলে একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে;
১৩) প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর মরদেহ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে দেশে আনয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ;
১৪) প্রবাসের আহত ও অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা ব্যয় বহনে নিয়োগকর্তা অপারগ হলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ;
১৫) বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে আটকে পড়া কর্মীদের নিরাপদে দেশে ফেরত আনয়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; যেমন- অতি সম্প্রতি ইরান হতে বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আনয়নে বোর্ড কর্তৃক আর্থিক সহায়তা;
১৬) অনাবাসী এবং অনিবন্ধিত বাংলাদেশীদের কল্যাণ বোর্ডের সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে দূতাবাসের মাধ্যমে বোর্ডের ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্তি;
১৭) প্রবাসী কর্মীদের যেকোনও সমস্যার সমাধানে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে অবহিত করতে ‘প্রবাসী কল সেন্টারের’ (সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা) মাধ্যমে সেবা প্রদান।
দেশে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ
১) বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে বিদেশগামী ও প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনে সহায়তা যেমন- লাগেজ র্যাপিং, লাগেজ প্রাপ্তি, ছুটির কাগজ প্রিন্ট, ফটোকপি ও সত্যায়ন, সেবাকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে সহায়তা, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সংক্রান্ত কার্যাদি সম্পাদনে সহায়তা;
২) প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই, টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও ফ্রি টেলিফোন সুবিধাসহ ৩০ শতাংশ ডিসকাউন্টে প্রবাসী ক্যাফেতে সুলভ মূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা;
৩) দেশের তিনটি বিমানবন্দরে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড কর্তৃক স্থাপিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে প্রবাস হতে আগত কর্মীর মরদেহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট হতে গ্রহণপূর্বক পরিবারের নিকট হস্তান্তর এবং মরদেহ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার চেক পরিবারকে প্রদান;
৪) বিমানবন্দর হতে আহত বা অসুস্থ ও মৃত কর্মী পরিবহনের জন্য ২টি ফ্রিজিংসহ ৫টি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ফ্রি সেবা প্রদান (ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ২টি বর্তমান সরকারের সময় যুক্ত);
৫) বিদেশে গুরুতর আহত ও অসুস্থ হয়ে ফেরত আসা কর্মীদের নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা;
৬) প্রবাস ফেরত আহত ও অসুস্থ কর্মীদের সর্বোচ্চ দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সহায়তা প্রদান। বিগত সরকারের সময়ে উক্ত সহায়তার পরিমাণ ছিল এক লক্ষ টাকা;
৭) প্রবাসী কর্মীর মেধাবী সন্তানদের এইচএসসি বা সমমান এবং গ্রাজুয়েশনে অধ্যায়নরতদের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান;
৮) প্রবাসী কর্মীর সন্তানদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে সহায়তা প্রদান;
৯) প্রবাসী কর্মীর প্রতিবন্ধী সন্তানদের মাসিক ভাতা প্রদান, বর্তমান সরকারের সময়ে মাসিক ভাতা এক হাজার টাকা হতে দুই হাজার করা হয়েছে;
১০) প্রবাসে মৃত কর্মীর প্রতি পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান;
১১) প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধার মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ-বকেয়া, বেতন-সার্ভিস, বেনিফিট-ইন্স্যুরেন্স বাবদ আদায়কৃত অর্থ পরিবারের নিকট বিতরণ;
১২) দেশে প্রবাসী কর্মীর সম্পদ রক্ষা এবং নানাবিধ অসুবিধা দূরীকরণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখা এবং জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের এক্সপ্যাট্রিয়েট হেল্প সেলের মাধ্যমে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান;
১৩) প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যেকোনও সমস্যায় ‘প্রবাসী কল সেন্টারের’ (টোল ফ্রি) মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান;
১৪) বিদেশগামী প্রবাসী কর্মীদের এককালীন এক হাজার টাকা প্রিমিয়ামে ৫ বছর মেয়াদে ১০ লাখ টাকাসহ মৃত্যুজনিত বীমা সুবিধা প্রদান;
১৫) ঢাকাস্থ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সন্নিকটে “ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারে” ফ্রি যাতায়াত, সাশ্রয়ী মূল্যে খাবারসহ মাত্র দুইশত টাকায় রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা;
১৬) রেইস প্রকল্পের মাধ্যমে ২ লাখ ৫৩ হাজার বিদেশ ফেরত কর্মীকে পুনঃএকত্রীকরণ বা পুনর্বাসনে আয়বর্ধক বিশেষ প্রশিক্ষণ (২০ হাজার), রেফারেলসহ আর্থিক সহায়তা প্রদান।
সানা/আপ্র/৫/৪/২০২৬