রাজধানী থেকে পার্বত্য অঞ্চল-দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, চালক ও পরিবহনশ্রমিকরা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানি, আবার কোথাও সামান্য তেল পেতে দিনভর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নগরজীবনে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে জীবিকার প্রধান মাধ্যমও স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার সকাল ছয়টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন চালক শহীদুল ইসলাম। ছয় ঘণ্টার বেশি অপেক্ষার পরও তিনি তেল পাননি। তিনি বলেন, ভোরে পাঁচটি পাম্প ঘুরেও কোথাও তেল মেলেনি। বাধ্য হয়ে এই পাম্পে দাঁড়িয়েছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “ছয় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। ছুটির অর্ধেক সময় কেটে গেল লাইনে দাঁড়িয়ে। তেল নিতে এসে ফেঁসে গেছি মনে হচ্ছে।”
একই পাম্পে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাহরিয়ার রহমান। তিনি জানান, খিলক্ষেত থেকে বের হয়ে তিনটি পাম্প ঘুরে এখানে এসেছেন। ছয় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, দুই দিন ধরে তেল না থাকায় রিজার্ভে চলছিল মোটরসাইকেল। “আজ তেল না পেলে রোববার অফিসে যেতে পারব না,” বলেন তিনি।
তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন আসাদগেট থেকে শুরু হয়ে জিয়া উদ্যান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দুপুর পর্যন্ত সেখানে ২৩০টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ১৩৮টি মোটরসাইকেল অপেক্ষায় ছিল। অনেক চালক গাড়ির মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ কেউ রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটান।
পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতেই তেল শেষ হয়ে যায়। নতুন করে তেল আনতে গাড়ি ডিপোতে পাঠানো হলেও সেখানেও দীর্ঘ লাইনের কারণে সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে।
শুধু এই পাম্প নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গাড়ির লাইন জাহাঙ্গীর গেট হয়ে মহাখালী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সেখানে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ি দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিল। অন্যদিকে মহাখালী, আসাদগেট ও তেজগাঁও এলাকার বিভিন্ন পাম্পেও একই ধরনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি নিয়মিত যাতায়াতের জন্য ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল মিলছে না। তিনি বলেন, তেল না থাকায় পড়াশোনা ও যাতায়াত-দুইই ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে রাজধানীর বাইরেও একই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
পাহাড়ে জীবিকা থমকে যাওয়া: খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য অঞ্চলে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলই প্রধান পরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেখানে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
চালকরা জানিয়েছেন, কোথাও ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ টাকার তেল মিলছে। এতে দৈনিক আয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা থেকে নেমে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
খাগড়াছড়ি মোটরসাইকেল চালক সমবায় সমিতির সভাপতি জানান, জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার চালক এই পেশার ওপর নির্ভরশীল, যারা বর্তমানে চরম সংকটে পড়েছেন।
মাটিরাঙার চালক মো. আলামিন বলেন, “এক লিটার তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। কীভাবে ভাড়া চালাব বুঝতে পারছি না। এক মাস ধরে এই অবস্থা।” তিনি জানান, বাধ্য হয়ে যাত্রী পরিবহন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
আরেক চালক মো. ইব্রাহিম বলেন, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে গেলেও তেল মিলছে না। পাহাড়ে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই বাইক, এখন সেটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
চালক ফরহাদ জানান, আয় এত কমে গেছে যে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের কাছে তেল মজুত নেই। ডিপো থেকে অল্প পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হলেও তা আসার পরপরই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যাচাই করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও প্রয়োজনীয় পরিবহনের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মহানগর থেকে পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত এই জ্বালানি সংকট এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকায় গভীর প্রভাব ফেলছে।
সানা/আপ্র/৪/৪/২০২৬