ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে তারেক রহমানের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও এখনো রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ উপনেতা, চিফ হুইপ ও হুইপ পদে কারা বসছেন তা নিয়ে দলটির ভেতরে চলছে আলোচনা। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে আগামী ১২ মার্চ বসছে সংসদ অধিবেশন।
দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা গঠনের পর এবার সংসদীয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি।
রাষ্ট্রপতি পদে চার শীর্ষ নেতার নাম: রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তারা হলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান।
অনেকে বলছেন, রাজনীতিতে আরো চমক দেখাতে পারেন তারেক রহমান। সেক্ষেত্রে দেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সেলিমা রহমানের নাম সামনে আসতে পারে। নারী নেতৃত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার কৌশল থাকতে পারে দলীয় প্রধানের। তবে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় রাজনীতির বাইরের কাউকে আনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আলোচনায় রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ও সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর নামও। এছাড়া সাবেক সচিব বা অবসরপ্রাপ্ত কোনো সেনাপ্রধানের নামও আলোচনায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান এম ওসমান ফারুক ও ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ও আশরাফ উদ্দিন নিজানের নাম শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। পাশাপাশি দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় সরকারদলীয় সদস্য ব্যতীত অন্য দল থেকেও একজন ডেপুটি স্পিকার মনোনয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংসদ উপনেতা, চিফ হুইপ ও হুইপ হচ্ছেন কারা: সংসদ উপনেতা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম। চিফ হুইপ পদে সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবদীন ফারুক ও ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনির নাম। হুইপ পদে আলোচনায় আছেন নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচিত এমরান আহমেদ চৌধুরী, সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়া, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম।
দলীয় একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে সংসদীয় কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের স্থান দেওয়া হবে। বিএনপির প্রচার দলের সভাপতি মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, দল একেক করে সৎ, যোগ্য ও পরীক্ষিত ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করবে। কেননা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মিছিলের শেষ মানুষটিও মূল্যায়িত হবে।
রাষ্ট্রপতি থেকে হুইপ পর্যন্ত বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে দলীয় আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দলের সর্বোচ্চ ফোরাম থেকেই নেওয়া হবে। বর্তমানে গণমাধ্যমে যে আলোচনা বা নাম ভেসে বেড়াচ্ছে, সেগুলো মূলত অনুমাননির্ভর। তবে জনগণের প্রত্যাশা আছে-অতীত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। আমরা চাই, সেই জনপ্রত্যাশা যেন পূরণ হয়।’
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘এই পদগুলো ঠিক করবেন জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ নেতা। আমি বা আমরা জানতে পারলো আপনাদের জানাবো।’
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে বিএনপি জোট। সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গত রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন বসবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। সেই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হবে, শোকপ্রস্তাব উত্থাপন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে। সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা। বিগত সংসদদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদ অধিবেশন কীভাবে শুরু হবে বা প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেটি নিয়েও নানান আলোচনা চলছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাও সভাপতিত্ব করতে পারেন।
সানা/আপ্র/২৪/২/২০২৬