ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবার রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রায় তিন ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন তাঁরা। আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মিরপুরেও সড়ক অবরোধের পাশাপাশি দুটি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এসব ঘটনায় পুলিশ, শ্রমিক ও পথচারীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর ও আশুলিয়ার অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আশুলিয়ায় উদ্ধার হয়েছে হাতবোমাসদৃশ তিনটি বস্তু।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ইন্টারস্টপ কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে পাশের ডিভাইন টেক্সটাইলসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। শ্রমিকেরা আশপাশের ময়লা-আবর্জনার বস্তা সড়কে ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী পর্যন্ত মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। শ্রমিকেরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এ ঘটনায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আশপাশের ১০ থেকে ১২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকেরা বলেন, বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগের মতো অতিরিক্ত কাজের সুযোগও নেই। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের বেতন বাড়েনি। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।
মহাসড়কে অবরোধের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকেরা। বাসচালক হারুন মিয়া বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চন্দ্রা এলাকায় বসে আছি। এর আগে গত বৃহস্পতিবারও একই পরিস্থিতি হয়েছিল। পোশাকশ্রমিকেরা প্রায়ই এভাবে রাস্তা বন্ধ করে রাখলে আমাদের কী হবে?’ যাত্রী মো. কাদের মিয়া জানান, জরুরি কাজে ঢাকায় যেতে হবে। চন্দ্রায় এসে বাস থেকে নেমে তাঁকে হেঁটে যেতে হচ্ছে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পোশাকশ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। তবে দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা উচিত। মানুষের জানমালের ক্ষতি ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, এমন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। আশপাশের ১০ থেকে ১২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, হাতবোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার
গাজীপুরের পাশাপাশি সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শনিবার সকাল থেকে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চিন্তপুর, কাঠগড়া, জিরাবো, নরসিংহপুর ও আমতলাসহ বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বন্ধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
প্রত্যক্ষদর্শী, শ্রমিক ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিশ্চিন্তপুরের নিউ এইজ অ্যাপারেলস ও নিউ এইজ গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা সকালে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে আল-মুসলিম, কন্টিনেন্টাল, এআর জিন্স, নাঈম সোয়েটার, এফএনএফ গার্মেন্টস ও টাউজার লাইনের শ্রমিকেরাও বিক্ষোভে যোগ দেন।
একপর্যায়ে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শ্রমিকেরাও ইটপাটকেল ছোড়েন। সংঘর্ষে শিল্প পুলিশের অন্তত পাঁচ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। অন্য একটি সূত্রে ছয় পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যে দুপুরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এইজ কারখানার সামনে থেকে হাতবোমাসদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়। শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সল ইসলাম বলেন, কারা এসব বস্তু সেখানে রেখে গেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি আশুলিয়া থানাকে জানানো হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম জানান, আন্দোলনের মুখে আশুলিয়ায় ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানা ও স্থানীয় সূত্রে অন্তত ২০টি কারখানায় ছুটির তথ্য পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন। এ কারণে মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে। তাঁর অভিযোগ, কারখানার মালিকপক্ষ যৌথভাবে শ্রমিকদের কালো তালিকা তৈরি করছে। এতে একবার চাকরি হারালে অন্য কারখানায় কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিরপুরে ভাঙচুর, যান চলাচলে বিঘ্ন
রাজধানীর মিরপুরেও শনিবার সকাল থেকে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়ায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ নম্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। এতে দিনভর যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
দুপুর ২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে সরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মিরপুর-১ নম্বরের মাজারসংলগ্ন বাজার ও মার্কেট এলাকায় যায়। সেখানে হিমালয় গার্মেন্টস ও বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এর আগে দুপুর ২টা ৫ মিনিটের দিকে হিমালয় গার্মেন্টসের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। পরে মিরপুর-১০ থেকে আসা শ্রমিকেরা প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভাঙচুর চালান। এ সময় ঘটনাস্থলে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক ছিলেন বলে পুলিশের তথ্য।
মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিল্প পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত দুই সপ্তাহ ধরেই গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাকসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও শ্রমিক অসন্তোষ কমেনি। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁদের দাবি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
সানা/আপ্র/৩১/১০/২০২৬