আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের বিল উত্থাপন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এরপর ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিল প্রণয়ন করবে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের যেসব মৌলিক বিষয়ে সংশোধন আনা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১৪২ অনুচ্ছেদ বা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানে পরিবর্তন এলে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকবে বলে জানান তিনি। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও সংবিধান সংশোধনের পর সাংবিধানিক গণভোটের কথা এসেছে।
সাংবিধানিক গণভোটের ব্যাখ্যায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোট সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে- একটি সাংবিধানিক গণভোট এবং অন্যটি আইনের কোনো বিষয়ে গণভোট। আইনের কোনো বিষয়ে জাতীয় ভিত্তিতে গণভোটের আয়োজন করা যেতে পারে। তবে সংবিধানে সাংবিধানিক গণভোটের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে গণভোট করা যাবে না- এমন বিধান নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
১৪২ অনুচ্ছেদ ও গণভোট: সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে আগে সাংবিধানিক গণভোটের বিধান ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল-সংক্রান্ত মামলার রায়ের পর ১৪২ অনুচ্ছেদের ওই বিধান আবার এসেছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদে সংবিধান সংশোধনী পাস হওয়ার পর যেসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকবে, সেগুলো রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটে পাঠানো হবে। গণভোটে পক্ষে ভোট পড়লে সংশোধনী অনুমোদিত হবে এবং এরপর রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করবেন।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাও গণভোটের আওতায়: সাংবিধানিক গণভোটের আওতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাবের কথাও জানান কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনে তাঁদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল- ভবিষ্যতে কোনো সংসদ যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করা।
তিনি বলেন, এ প্রস্তাবের সঙ্গে আরো একটি বিষয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করতে চাইলে সেটিও গণভোটের আওতায় আনতে হবে। বিএনপির পক্ষ থেকেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধানসহ আরো দুটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান: সংবিধান সংশোধনের কাজে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা কমিটিতে যোগ দিলে তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে। গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবগুলো সবার মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, কমিটির পক্ষ থেকে বারবার বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা কমিটির নেই; শুধু আহ্বান জানানো ও আশা করা যায়।
রোববারের বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বিভিন্ন সাংবাদিক ফোরামের প্রতিনিধিরা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন। সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তফসিল নিয়েও মতামত পাওয়া গেছে। অংশগ্রহণকারীদের লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব মতামত কমিটির প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছেন সভাপতি।
জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহার: সংবিধান সংশোধনে জুলাই জাতীয় সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান কমিটির সভাপতি। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বা ঐকমত্যের ভিত্তিতে আসেনি, সেগুলোও বিবেচনা করা হবে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত প্রস্তাবও আলোচনায় রাখা হবে।
ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন, জানুয়ারিতে বিল: কমিটির সভাপতি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। এরপর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবিধান সংশোধনের বিল আনবে।
তিনি বলেন, আগামী বছরের প্রথম অধিবেশন, অর্থাৎ জানুয়ারি অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন হতে পারে। বিলের ওপর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও বিরোধিতা থাকলে সেগুলো বিবেচনার পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংশোধনী পাস হবে। গণভোটের বাধ্যবাধকতা থাকা সংশোধনীগুলো রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটে যাবে।
সানা/আপ্র/২৭/৯/২০২৬