কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম আহমেদ নামে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যাওয়ার পর তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিমকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কুমিল্লা কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মফিজ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়। পরে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিম আহমেদকে আটক করা হয়েছে। তাদের দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের বিশেষ দল অভিযান চালাচ্ছে জানিয়ে মফিজ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তে অগ্রগতি পাওয়ার আশা করছে পুলিশ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রকিবুল ইসলামও তিন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তুহিনকে, সন্ধ্যা ৭টার দিকে আনাসকে এবং এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর ফাহিমকে আটক করা হয়।
অপ্রতিমকে ডেকে নেওয়ার দাবি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম জানিয়েছেন, তুহিন নামের একজন অপ্রতিমকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। শনিবার লালমাই পাহাড়ের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণের সময় শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অপ্রতিমকে তার চেয়ে বড় এক ছেলের সঙ্গে দেখা যায়। ওই তরুণের পরনে টুপি ও সাদা শার্ট ছিল।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তরুণের চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তার পরিচয় তুহিন হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের নেতৃত্বে একটি দল তুহিনের বাড়ির দিকে যাওয়ার পর স্থানীয় একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজেও অপ্রতিমের সঙ্গে তাকে দেখা যায়।
উপাচার্য আরও বলেন, তুহিনের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা পাওয়া যায় এবং তার মুঠোফোন তল্লাশি করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে ধারণা করা হচ্ছে অপ্রতিমকে বারবার বাসা থেকে বের হয়ে আসতে বলছিল তুহিন। তবে এসব তথ্য তদন্তাধীন এবং হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
অপ্রতিমের মায়ের আইফোনকে কেন্দ্র করে ঘটনা ঘটেছে কি না জানতে চাইলে কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মফিজ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, পুলিশ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে; এখনই সবকিছু প্রকাশ করা হচ্ছে না।
নিখোঁজের পর পাহাড়ে মরদেহ
শুক্রবার বিকালে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে মরদেহের সঙ্গে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা অপ্রতিমের সন্ধানে বিভিন্নভাবে তৎপর ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মধ্যেই লালমাই পাহাড়ের গভীরে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর আসে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থলে যান।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। ঘটনাটি স্পর্শকাতর হওয়ায় তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তারের পর বিস্তারিত জানানো হবে বলে তিনি জানান।
ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত
অপ্রতিম হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শনিবার বিকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ শোক ঘোষণা করেছে। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার স্বাক্ষরিত নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আব্দুল হাকিম বলেন, অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে। স্থগিত ক্লাস ও পরীক্ষা পরবর্তীতে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী নেওয়া হবে।
এদিকে শনিবার রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে অপ্রতিমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অপ্রতিম ছিলেন নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে আটক তিনজনের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সানা/আপ্র/২০/৯/২০২৬