জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়েছেন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ফলে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন মির্জা ফখরুল।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলো দেশে। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হয়েছিল। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে ভোট পরিচালনার নিয়মাবলি তুলে ধরেন। এরপর সংসদ সদস্যদের আসনে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়া হয়। তাঁরা নিজ নিজ আসনে বসে পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়ে নির্ধারিত বাক্সে ব্যালট জমা দেন।
প্রথমে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট দেন। ভোটগ্রহণ চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তিনটি ব্যালট বাক্সে পর্যায়ক্রমে ভোট নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন এবং ছয়টি ব্যালট অব্যবহৃত ছিল। ব্যবহৃত ৩৪৩টি ব্যালটের সবগুলোই বৈধ ঘোষণা করা হয়। ভোটগ্রহণের সময় ভুল-ত্রুটির কারণে চারটি ব্যালট পেপার পরিবর্তন করা হয়। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালার ১০ নম্বর বিধি অনুযায়ী এসব ব্যালট প্রতিস্থাপন করা হয়।
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্স খোলা হয়। প্রকাশ্যে ভোট গণনা শেষে বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার পরই মির্জা ফখরুলকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপির বাইরে থেকেও মির্জা ফখরুল ১১টি ভোট পেয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শুক্রবার শপথ: নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন। শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুল দিয়ে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানান। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি কামাল হোসেন এবং পরাজিত প্রার্থী অলি আহমদও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। চীনা দূতাবাসও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, নতুন যুগে দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
তৃণমূল থেকে বঙ্গভবনে: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় তাঁর জন্ম। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ও এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাবরণ করেন।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগ দেন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত টানা সেই দায়িত্বেই ছিলেন তিনি।
দলের সংকটে নেতৃত্ব, এরপর সরকারে: দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল বিএনপির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও ছিলেন। এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দলীয় আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ে দেশের ভেতরে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন তিনি।
আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি একাধিক মামলায় তিনি আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন এবং কয়েক দফা কারাবরণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজপথের আন্দোলনে তিনি কার্যত গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় এক দশক পর ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬