প্রত্যাশা ডেস্ক: এক থালা সুগন্ধি বিরিয়ানি-নাম শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঝরঝরে চাল, মাংসের নরম টুকরো, জাফরানের ঘ্রাণ আর মসলার অপূর্ব মিশ্রণ। দক্ষিণ এশিয়ায় তো বটেই, বিশ্বের নানা প্রান্তে এখন এটি অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। কিন্তু এই বহুল প্রিয় খাবারের জন্ম কোথায়-এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
অধিকাংশ মানুষের ধারণা, বিরিয়ানির জন্ম ভারতেই। কারণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি বিরিয়ানির নিজস্ব ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই খাবারের শিকড় একাধিক সংস্কৃতি ও অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস: খাদ্য ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির উৎস ফার্সি ভাষার ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ শব্দ থেকে। এর অর্থ ভেজে নেওয়া চাল। আবার ‘বিরিয়ান’ শব্দের অর্থ রান্নার আগে ভাজা বা প্রস্তুত করা। শব্দটির এই উৎস ইঙ্গিত দেয়, বিরিয়ানির ইতিহাসে পারস্যের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে শুধু একটি শব্দের ভিত্তিতে এর সম্পূর্ণ উৎপত্তি নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ চাল ও মাংসের সংমিশ্রণে তৈরি খাবারের প্রচলন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু আগে থেকেই ছিল।
পারস্যের রাজকীয় রান্নাঘর থেকে যাত্রা? অনেক রন্ধন ইতিহাসবিদের মতে, বিরিয়ানির প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে পারস্যের পোলাও জাতীয় খাবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পারস্যের রাজকীয় রান্নাঘরে চাল, মাংস, ঘি, শুকনো ফল, বাদাম ও মসলার সমন্বয়ে নানা ধরনের সমৃদ্ধ খাবার তৈরি করা হতো।
বিশেষ করে অল্প আঁচে পাত্রের মুখ বন্ধ করে রান্নার যে পদ্ধতি, দক্ষিণ এশিয়ায় যা ‘দম’ রান্না নামে পরিচিত, তার সঙ্গে পারস্যের প্রাচীন রান্নার মিল পাওয়া যায়।
ধারণা করা হয়, বাণিজ্যপথ, সেনা অভিযান ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই ধরনের খাবারের ধারণা মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছায়।
মোগল আমলে পেল নতুন পরিচয়: বিরিয়ানির ইতিহাসে মোগল আমল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৫২৬ সালে বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর মধ্য এশিয়া ও পারস্যের নানা খাদ্য ঐতিহ্য ভারতীয় রান্নার সঙ্গে মিশতে শুরু করে।
মোগল দরবারে চাল, মাংস ও মসলার সমন্বয়ে তৈরি নানা খাবারের প্রচলন ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব খাবার ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় উপকরণ ও রান্নার কৌশলের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ পায়।
তবে ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির ব্যবহার মোগল আমলে ঠিক কখন জনপ্রিয় হয়, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে সম্রাট আকবরের আমলের ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে বিরিয়ানি বা অনুরূপ খাবারের উল্লেখের কথা বলা হয়।
ভারতের মাটিতে পেল নিজস্ব স্বাদ: ভারতে এসে বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার হিসেবে থাকেনি, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে নানা স্বতন্ত্র ধরন।
লখনউয়ের বিরিয়ানি তার সূক্ষ্ম স্বাদ, সুগন্ধ ও মৃদু মসলার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে হায়দরাবাদি বিরিয়ানি জাফরান, ঝাল মসলা এবং বিশেষ রান্নার পদ্ধতির কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। কলকাতা, মালাবারসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও বিরিয়ানি পেয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
ক্ষিণ ভারতের পুরোনো দাবিও রয়েছে: বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে আরেকটি মত হলো, চাল ও মাংসের সমন্বয়ে তৈরি খাবারের ঐতিহ্য দক্ষিণ ভারতে আরো আগে থেকেই ছিল। কিছু গবেষক প্রাচীন তামিল অঞ্চলের চাল-মাংসের খাবারের সঙ্গে বিরিয়ানির মিল খুঁজে পান। তবে এসব খাবার সরাসরি আধুনিক বিরিয়ানির পূর্বসূরি কি না, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
তাহলে বিরিয়ানির আসল জন্মভূমি কোথায়? ইতিহাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিরিয়ানিকে কোনো একটি দেশের একক আবিষ্কার বলা কঠিন। এর নামের সঙ্গে পারস্যের যোগ রয়েছে, মধ্য এশিয়ার খাদ্য ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে, আর ভারতীয় উপমহাদেশে এসে এটি পেয়েছে বৈচিত্র্য, স্বতন্ত্র স্বাদ ও বিশ্বজোড়া পরিচিতি।
হয়তো এ কারণেই বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার নয়-এটি বহু শতাব্দীর ভ্রমণ, সংস্কৃতির বিনিময় এবং মানুষের রুচির বিবর্তনের এক সুস্বাদু ইতিহাস। সূত্র: এনডিটিভি, অন্যান্য আন্তর্জাতিক খাদ্য ইতিহাসভিত্তিক উৎস
সানা/ডিসি/আপ্র/২৬/৭/২০২৬