একটি স্মার্টফোনের জন্য মানুষের এতটা আগ্রহ কেন—প্রশ্নটি নতুন নয়। আইফোনকে ঘিরে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনেছে। সম্প্রতি মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়ে লাশ হয়ে ফেরে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম।
২০২৬ সালের আগস্টে ভারতের মহারাষ্ট্রে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ নতুন আইফোন চাওয়া এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে দ্বন্দ্বের পর পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। তাকে থামাতে গিয়ে তার বাবা-মায়েরও মৃত্যু হয়। তবে পরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাটির পেছনে পারিবারিক টানাপোড়েনের বিষয়টিও উঠে আসে। ফলে পুরো ঘটনাকে শুধু একটি ফোন কেনার বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—আইফোন কেন মানুষের কাছে এত আকর্ষণীয়? বাজারে স্যামসাং, গুগল, শাওমি, ভিভো, অপ্পোসহ আরো অনেক স্মার্টফোন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সেসব ফোনের হার্ডওয়্যারও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাহলে আইফোনের বিশেষত্ব কোথায়?
শুধু ফোন নয়, ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা
আইফোনের বড় শক্তি সম্ভবত শুধু ক্যামেরা, প্রসেসর বা নকশা নয়; বরং পুরো ব্যবহার-অভিজ্ঞতা। অ্যাপল হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার—দুটিই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে ফোন, পরিচালন ব্যবস্থা, অ্যাপ ও বিভিন্ন সেবার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব হয়।
একজন ব্যবহারকারী যদি আইফোনের পাশাপাশি ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ বা এয়ারপডস ব্যবহার করেন, তাহলে একাধিক যন্ত্রের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেওয়া সহজ হয়। গবেষণাতেও অ্যাপলের এই পরস্পর-সংযুক্ত পণ্যব্যবস্থাকে ব্যবহারকারীর আনুগত্য তৈরির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্র্যান্ডের আলাদা পরিচয়
আইফোন শুধু প্রযুক্তিপণ্য নয়, অনেকের কাছে এটি একটি ব্র্যান্ড-পরিচয়ের অংশ। নতুন মডেল বাজারে আসার আগে থেকেই এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হওয়ার পেছনে ব্র্যান্ড-ভাবমূর্তির বড় ভূমিকা রয়েছে।
নকশা, বিজ্ঞাপন, অ্যাপল স্টোরের অভিজ্ঞতা এবং পণ্যের উপস্থাপন—সব মিলিয়ে অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরে আইফোনকে একটি উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে কারো কাছে নতুন আইফোন কেনা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে একটি অর্জন বা সামাজিক পরিচয়ের বিষয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ফোনের ছবি, বাক্স খোলার ভিডিও এবং ক্যামেরা পরীক্ষার মতো বিষয় এই আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়। একটি নতুন আইফোন তাই শুধু একজনের কেনাকাটার বিষয় থাকে না; সেটি দ্রুত সামাজিক আলোচনার অংশ হয়ে যায়।
দাম বেশি বলেই কি চাহিদা বেশি?
এখানেও মানুষের মনস্তত্ত্ব কাজ করে। কোনো পণ্য যখন তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়, তখন সেটিকে অনেকেই উচ্চমানের বা বিশেষ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। ভারতে ২০২৬ সালের নতুন আইফোনগুলোর দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা হয়েছে। কিছু মডেলের মূল্যবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে দাম বেশি হলেই পণ্যটি ভালো—এমন সরল সমীকরণ করা যায় না। একই দামের মধ্যে অন্য ব্র্যান্ডের কোনো কোনো ফোনে বেশি র্যাম, দ্রুত চার্জিং, বড় ব্যাটারি বা উন্নত জুম ক্যামেরা পাওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ
আইফোনের প্রতি আনুগত্যের আরেকটি কারণ হলো দীর্ঘদিন একই প্ল্যাটফর্মে থাকার অভ্যাস। ২০২৬ সালের একটি মার্কিন জরিপে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ আইফোন ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, পরবর্তী ফোন কেনার সময়ও তারা আইফোন বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁদের মধ্যে পরিচালন ব্যবস্থা পছন্দ এবং অ্যাপলের পণ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ—দুটি কারণই উল্লেখযোগ্য ছিল।
তবে জরিপটি ৫ হাজার মার্কিন উত্তরদাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই পুরো বিশ্বের আইফোন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও একই হার প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
একবার কেউ আইফোন, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডস, আইক্লাউড ও অন্যান্য অ্যাপল সেবার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেলে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়া কিছুটা ঝামেলার মনে হতে পারে। গবেষণাতেও এই প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তনের খরচকে অ্যাপল পণ্যব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে।
তাহলে কি আইফোন অন্য ফোনের চেয়ে অনেক ভালো?
এর উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। স্মার্টফোন বেছে নেওয়া নির্ভর করে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন, বাজেট ও পছন্দের ওপর। কেউ ক্যামেরাকে গুরুত্ব দেন, কেউ খেলাধুলাভিত্তিক ব্যবহারকে, কেউ ব্যাটারিকে, আবার কারো কাছে সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আইফোনের আকর্ষণ তাই একটি মাত্র সুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে ব্র্যান্ডের দীর্ঘদিনের পরিচিতি, নকশা, সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, পণ্যব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ, সামাজিক প্রভাব এবং নতুন মডেল ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা।
তবে এই আকর্ষণ যেন অন্ধ আবেগে পরিণত না হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্মার্টফোন প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হতে পারে, কিন্তু সেটি মানুষের জীবন, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বা সম্পর্কের চেয়ে বড় নয়।
আইফোনের প্রতি মানুষের আগ্রহ হয়তো আরো বাড়বে। নতুন মডেল আসবে, নতুন সুবিধা যুক্ত হবে, আবার নতুন করে শুরু হবে আলোচনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি একটি স্মার্টফোনই। এর মূল্য যতই হোক, মানুষের জীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি।
এসি/আপ্র/২০/৯/২০২৬