মিরপুরের আকাশে সেদিন শুধু বিজয়ের উল্লাসই ভাসেনি, লেখা হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক নতুন মহাকাব্য। যে অস্ট্রেলিয়াকে একসময় হারানো ছিল স্বপ্নের মতো, সেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টানা দ্বিতীয়বার পরাজিত করে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি, ড্রেসিংরুম আর কোটি সমর্থকের হৃদয়জুড়ে তাই একটাই অনুভূতি—এটি কেবল একটি সিরিজ জয় নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরিণত শক্তিতে রূপ নেওয়ার ঘোষণাপত্র।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে অপ্রতিরোধ্য এগিয়ে যায় মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।
ম্যাচের শুরুতেই যেন ঝড় নামান বাংলাদেশের পেসাররা। তাসকিন আহমেদের আগুনঝরা স্পেল আর মুস্তাফিজুর রহমানের নিখুঁত কাটার অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। মাত্র দুই ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে কোনো রান না উঠতেই তিন উইকেট হারিয়ে বসে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ওয়ানডে ইতিহাসে ১ হাজারের বেশি ম্যাচ খেলা অস্ট্রেলিয়ার জন্য এমন বিপর্যয় ছিল নজিরবিহীন। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল দলটি প্রথমবারের মতো শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর লজ্জাজনক রেকর্ড গড়ে বসে মিরপুরে।
তাসকিনের বলে ম্যাথু শর্টের স্টাম্প ভাঙার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। এরপর মুস্তাফিজ ফেরান কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশকে। মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুম।
তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা লড়াই ছাড়া হার মানেনি। জশ ইংলিস, ক্যামেরন গ্রিন এবং পরে মার্নাস লাবুশেন ও জেভিয়ার বার্টলেটের জুটিতে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে তারা। বিশেষ করে সপ্তম উইকেটে লাবুশেন-বার্টলেটের ১০৩ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে সম্মানজনক সংগ্রহের পথে এগিয়ে দেয়।
লাবুশেন ৫৫ রানে অপরাজিত থাকেন, বার্টলেট খেলেন ৫২ রানের সাহসী ইনিংস। কিন্তু ইনিংসের শেষদিকে আবারও আঘাত হানেন তাসকিন। পরপর দুই বলে বার্টলেট ও জাম্পাকে ফিরিয়ে সফরকারীদের থামিয়ে দেন ৪২ ওভারে ১৮৭ রানে।
বৃষ্টির কারণে দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের সামনে নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
কিন্তু রান তাড়ার শুরুটাও সহজ ছিল না। প্রথম ওভারেই ফিরে যান তানজিদ হাসান। শূন্য রানে এক উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
সেই চাপ সামাল দেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকার। দুজনের ব্যাটে আসে সাবলীলতা, আত্মবিশ্বাস আর প্রতিরোধের বার্তা। দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে আসেন তারা।
দুজনই ৪২ রান করে আউট হলেও ম্যাচের ভিত গড়ে দিয়ে যান।
এরপর লিটন দাস করেন ২১ রান। মোসাদ্দেক হোসেন দ্রুত ১৫ রান যোগ করলেও ১৪৪ রানে পঞ্চম উইকেট হারিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয় বাংলাদেশের ডাগআউটে।
তখনও প্রয়োজন ছিল ৪৮ রান।
ঠিক সেই মুহূর্তে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তাওহিদ হৃদয় ও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। কোনো রকম তাড়াহুড়ো নয়, আবার অতিরিক্ত রক্ষণাত্মকও নয়—দুজন মিলে পরিণত ব্যাটিংয়ে ম্যাচটিকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে টেনে আনেন।
ম্যাচের এক পর্যায়ে ন্যাথান এলিসের বাউন্সার মিরাজের হেলমেটে আঘাত হানে। মুহূর্তের জন্য পুরো স্টেডিয়াম উদ্বেগে স্তব্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসক মাঠে আসেন, স্ট্রেচারও প্রস্তুত রাখা হয়। কিন্তু অধিনায়কের চোখে তখন পরাজয়ের ভয় নয়, জয়ের সংকল্প।
চিকিৎসা শেষে আবার ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে যান মিরাজ। আর সেখান থেকেই বাংলাদেশের বিজয়ের গল্প আরও দ্রুত এগিয়ে যায়।
শেষদিকে হৃদয়ের ছক্কা-চারে সমীকরণ সহজ হয়ে আসে। এরপর মিরাজের উড়ন্ত ছক্কায় নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়।
৩৬ বল হাতে রেখেই জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।
হৃদয় অপরাজিত থাকেন ৪০ রানে, মিরাজ ২২ রানে।
বল হাতে তিনটি করে উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন মুস্তাফিজুর রহমান। সমান তিন উইকেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তাসকিন আহমেদ।
এই জয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন লক্ষ্য—হোয়াইটওয়াশ। সিরিজ ইতোমধ্যেই নিশ্চিত, এবার চোখ ৩-০ ব্যবধানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিদায় জানানোর দিকে।
একসময় যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় ছিল রূপকথার মতো, আজ সেই অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বাভাবিক বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে—বাংলাদেশ এখন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের শক্তিশালী দাবিদার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ৪২ ওভারে ১৮৭/৮
(লাবুশেন ৫৫, বার্টলেট ৫২; তাসকিন ৩/৩৩, মুস্তাফিজ ৩/২৭, তানভীর ২/৪৫)
বাংলাদেশ: ৩৫ ওভারে ১৯৫/৫ (ডিএলএস লক্ষ্য ১৯২)
(শান্ত ৬৭, সৌম্য ৪২, হৃদয় ৪০, মিরাজ ২২; বার্টলেট ১/২৩)
ফল: বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী (ডিএলএস)
সিরিজ: বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, সিরিজ নিশ্চিত
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুস্তাফিজুর রহমান।