ইসরায়েলি হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর পাল্টা আঘাত জোরদার করেছে তেহরান। বুধবার (১৮ মার্চ) ইসরায়েলের তেল আবিবসহ মধ্যাঞ্চলে গুচ্ছ বোমাযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত দুইজন নিহত এবং বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, লারিজানির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা। একই সঙ্গে ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, ইরান বারবার গুচ্ছ বোমা ব্যবহার করছে, যা মাঝ আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর-জেরুজালেম, রামাত গান ও বেনি ব্রাকেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। একাধিক বিস্ফোরণে যানবাহন ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে।
বৈরুতসহ লেবাননে বিস্তৃত ইসরায়েলি হামলা: লেবাননের রাজধানী বৈরুত-এর কেন্দ্রস্থলে বুধবার ভোরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৪১ জন আহত হয়েছেন। কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই জনবহুল এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। এর পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে স্থল ও বিমান অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাব হিসেবে তারা নতুন নতুন এলাকায় প্রবেশ করছে।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বোমাবর্ষণ: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সচল করতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, উপকূলীয় ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে প্রায় পাঁচ হাজার পাউন্ড ওজনের গভীর অনুপ্রবেশকারী বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্য ছিল জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, যা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপ: যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো এ পথ এড়িয়ে চললেও ইরানের নিজস্ব ও মিত্র জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ১৭টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে বিমা ব্যয় বেড়ে গেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শক্তি প্রদর্শন ও নতুন অস্ত্র: মার্কিন বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক আকাশ শক্তি মোতায়েন করেছে-উন্নত যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও ড্রোনসহ প্রায় দুই শতাধিক বিমান এ অভিযানে যুক্ত। একই সঙ্গে সুপার হরনেট যুদ্ধবিমানে নতুন স্মার্ট অস্ত্র ‘স্টর্মব্রেকার’ ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অস্ত্র প্রতিকূল আবহাওয়াতেও দূরপাল্লা থেকে স্থির ও চলমান লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম।
সস্তা ড্রোনে বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের রূপ: যুদ্ধে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে স্বল্পমূল্যের আক্রমণাত্মক ড্রোন। ইরানের শাহেদ ড্রোন ব্যাপক হারে ব্যবহার করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে।
একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের দামে শতাধিক ড্রোন তৈরি সম্ভব হওয়ায় আক্রমণ এখন অনেক সস্তা, কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যয় অত্যন্ত বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসছে।
আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন: ইসরায়েল আরো কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চালানোর পরিকল্পনা করেছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশগুলোর স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তারা কোনো যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বার্তা বিনিময়ও হয়নি।
লারিজানি হত্যার পর নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা: ইরানের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি লারিজানির মৃত্যুর পর নতুন নিরাপত্তা প্রধান কে হবেন তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সাঈদ জালিলি-র নাম সামনে আসছে।
মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম। জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা নতুন রেকর্ডে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ দমন: ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-কে তথ্য সরবরাহের অভিযোগে ইরানে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা চলমান সংঘাতকে আরো তীব্র করেছে।
সমগ্র পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত এখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। আকাশ, স্থল ও সমুদ্র-সব ক্ষেত্রেই পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়ছে। নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
সানা/আপ্র/১৮/৩/২০২৬