মার্কিন নৌ-অবরোধ ও বিমান সংস্থাগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের নৌ ও আকাশপথের বাণিজ্য আগে থেকেই সংকুচিত। এবার পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের সীমান্তে বিধিনিষেধ এবং পণ্য পরিবহনে কড়াকড়ির কারণে দেশটির স্থলবাণিজ্যও গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্য আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ ও পণ্য পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে ইরানের স্থলবাণিজ্যপথে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক চাপ। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ছাড় আদায় করাই ওয়াশিংটনের এই চাপের লক্ষ্য।
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালও প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্ত বিধিনিষেধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নৌ ও আকাশপথের বাণিজ্যে বাধার পাশাপাশি নতুন সীমান্ত বিধিনিষেধ ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ লেনদেন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে স্থলবাণিজ্য বাড়িয়ে এ ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়াও কঠিন। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পরিবহন জটিলতা এবং যুদ্ধের কারণে আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিকল্প পথে বাণিজ্য পরিচালনার সুযোগ সীমিত।
পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের সীমান্তে বাধা: পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ গাবদ-রিমদান ও তাফতান সীমান্ত ক্রসিংয়ে কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। নিরাপত্তা ও চোরাচালান প্রতিরোধের কথা বলে দেশটি এ বিধিনিষেধ আরোপ করে। বর্তমানে ওই দুটি সীমান্ত দিয়ে কেবল ইরানি গ্যাসবাহী ট্যাংকার এবং পচনশীল ফল ও সবজির চালান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক সপ্তাহের স্থগিতাদেশের পর শনিবার গাবদ-রিমদান সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় চালু হয়েছে। সেখানে ১৬ অক্টোবর বা তার আগে ইস্যু করা চালানপত্র থাকা বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সীমান্ত চালু হলেও বাণিজ্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তাফতান সীমান্তের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নির্দেশে ইরানের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ আল-শাইব সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করা হয়েছে। ইরাকি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা এবং চোরাচালান প্রতিরোধের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাদক ও জাল মুদ্রা পাচারকারী চক্রের তৎপরতা ঠেকানোর বিষয়টিও সিদ্ধান্তটির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, ইরানের সঙ্গে চালু থাকা সীমান্ত ক্রসিংয়ের সংখ্যা কমাতে ইরাক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে ইরাকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে মার্কিন চাপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও আল-শাইব ক্রসিং বন্ধের খবর দিয়েছে; সেখানে জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথ তুরস্কের বাজারগান সীমান্ত ক্রসিংয়েও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ইরানি ট্রাক প্রবেশের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি ট্রাক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে বলে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে। এতে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা: ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই স্বীকার করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এর ফলে পরিবারগুলোকে মূল্য দিতে হবে, বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতির কয়েকটি খাত সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে। তবে অর্থনৈতিক চাপের কারণে তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নেবে, এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, স্থল, নৌ ও আকাশপথে বিধিনিষেধ ইরানের আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিকল্প পথের সীমাবদ্ধতা ও সীমান্তে পরিবহন জটিলতা সামাল দিতে না পারলে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হতে পারে।
সানা/আপ্র/২৬/১০/২০২৬