একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নগরীর পতেঙ্গা-উত্তর হালিশহর এলাকার সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে আড়াই হাজার একর জায়গায় নির্মিত হচ্ছে বে-টার্মিনাল। ২০৩০ সালে প্রথম টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজ। এটি চালু হলে বর্তমান বন্দরের অবকাঠামোর চেয়েও বড় সুবিধা তৈরি হবে। ভিড়তে পারবে আরো বড় আকারের জাহাজ বা মাদার ভেসেল। চ্যানেলের গভীরতা বেশি হওয়ায় ভাটার সময়ও জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বে-টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে আগামী একশ বছর নতুন টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলের গভীরতা কম থাকায় জাহাজ আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে জোয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। বে-টার্মিনালসংলগ্ন চ্যানেলের গভীরতা বেশি হওয়ায় এ সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
জানা গেছে, মেগা প্রকল্পটির প্রস্তাবিত তিনটি টার্মিনালের একটির নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিতে শিগগিরই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে। বর্তমানে প্রকল্পের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল তৈরির কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে প্রথম ধাপে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ঢেউ প্রতিরোধক বাঁধ, জাহাজ চলাচলের নৌপথ এবং মূল অবকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, নৌপথ ও ঢেউ প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই। অন্যদিকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করবে টার্মিনাল এবং সংযোজন করবে পণ্য ওঠানো-নামানোর সরঞ্জাম। নির্মাণকাজ শেষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পাবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল বিনিয়োগ। সরকার প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকটি বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বে-টার্মিনালে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রকল্পে থাকবে তিনটি পৃথক টার্মিনাল। এর মধ্যে একটি হবে বহুমুখী টার্মিনাল, যেখানে কনটেইনারের পাশাপাশি খোলা পণ্যও ওঠানো-নামানো যাবে। বাকি দুটি হবে কনটেইনার টার্মিনাল। এর মধ্যে বে-টার্মিনাল-১ নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুরের পিএসএর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চুক্তি হতে পারে বলে সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। অন্য দুটি টার্মিনাল নির্মাণেও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বে-টার্মিনালের ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল তৈরির কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দরপত্রের নথি তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে নৌপথ ও ঢেউ প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়াও শুরু হবে। তিনি জানান, নৌপথ ও ঢেউ প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণের জন্য এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বে-টার্মিনালের আওতায় সাগরে ৮০০ থেকে ১২০০ মিটার প্রস্থের নৌপথ থাকবে। এ পথে ১২ মিটার ড্রাফট এবং ২৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভিড়তে পারবে। একসঙ্গে ছয় হাজার কনটেইনার বহনে সক্ষম জাহাজও এ টার্মিনালে আসতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটার ড্রাফট ও ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা নেই।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বছরে ৩৪ লাখ টিইইউএস বা ২০ ফুট সমমানের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ করে। বে-টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সানা/আপ্র/২৬/১০/২০২৬