প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে সৌরজগতের দূরবর্তী প্রান্তে বড় একটি বরফাবৃত মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বস্তুটিকে সম্ভাব্য বামন গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে বামন গ্রহ কি না, তা নিশ্চিত হতে আরো পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।
চিলির মধ্যভাগে সেরো পাচোঁ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত শক্তিশালী ভেরা সি. রুবিন মানমন্দিরের টেলিস্কোপের সাহায্যে বস্তুটি শনাক্ত করা হয়। ‘২০২৬ ইডি১৩৮’ নাম দেওয়া এই মহাজাগতিক বস্তুর ব্যাস আনুমানিক ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। আকারের প্রাথমিক হিসাব সঠিক হলে এটি নেপচুনের বাইরের অঞ্চলে আবিষ্কৃত বৃহত্তম বামন গ্রহপ্রার্থীদের অন্যতম হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বস্তুটি বর্তমানে সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক দূরত্বে অবস্থান করছে। এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক বলতে পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বকে বোঝায়। তুলনায় বামন গ্রহ প্লুটো সূর্য থেকে গড়ে প্রায় ৪০ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক দূরে অবস্থান করে। অর্থাৎ নতুন বস্তুটি প্লুটোর কক্ষপথেরও বাইরে।
বিজ্ঞানী ম্যাট হোলম্যান চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর রুবিন মানমন্দিরের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথম বস্তুটির সন্ধান পান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ও স্মিথসোনিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রের জ্যোতির্বিজ্ঞানী। দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধি শনাক্ত করার জন্য তৈরি নিজস্ব অনুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি বস্তুটির সন্ধান পান। পরে গবেষক মারিও জুরিচ মানমন্দিরের তথ্যভান্ডার ও ছবিতে আরো ২০টি পর্যবেক্ষণের সন্ধান পান।
গবেষকদের হিসাবে, ২০২৬ সালের ৪ মার্চ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ২০টি রাতে মোট ৩০ বার বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, অন্য টেলিস্কোপের সংরক্ষিত পুরোনো ছবিতেও এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ে বস্তুটির কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
বস্তুটির কক্ষপথ সৌরজগতের মূল তলের সঙ্গে প্রায় ২৫ ডিগ্রি হেলে রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, নেপচুনের মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে একসময় এর আদি কক্ষপথে পরিবর্তন ঘটেছিল। সূর্য থেকে নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত বরফাবৃত মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে সাধারণভাবে নেপচুন-অতিক্রমী বস্তু বলা হয়। ২০২৬ ইডি১৩৮ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
বামন গ্রহের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর শুধু বড় আকারের হলেই চলে না। নিজস্ব অভিকর্ষ বলের প্রভাবে সেটিকে প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত ভর থাকতে হয়। পাশাপাশি সেটি সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে হবে এবং নিজের কক্ষপথের আশপাশের অন্য বস্তুগুলোকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হতে পারবে না।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ২০২৬ ইডি১৩৮-এর ভর ও আকার বামন গ্রহ হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এর প্রকৃত ব্যাস, পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য ও গঠন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে বস্তুটি কতটা সূর্যালোক প্রতিফলিত করে, তার ওপর নির্ভর করছে এর আকারের প্রাথমিক হিসাব।
ম্যাট হোলম্যান বলেছেন, এই মুহূর্তে গবেষকদের প্রধান কাজ বস্তুটির প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা। রুবিন মানমন্দিরের টেলিস্কোপে বস্তুটি থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু একই পরিমাণ আলো একটি ছোট ও বেশি উজ্জ্বল বস্তু যেমন প্রতিফলিত করতে পারে, তেমনি বড় কিন্তু কম উজ্জ্বল বস্তু থেকেও আসতে পারে। ফলে শুধু প্রতিফলিত আলোর পরিমাণ দিয়ে এর প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা কঠিন।
এ সমস্যা সমাধানে চিলিতে অবস্থিত অ্যাটাকামা লার্জ মিলিমিটার ও সাবমিলিমিটার অ্যারে বা অ্যালমার মতো শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের। দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বস্তুটি থেকে নির্গত নিজস্ব তাপীয় বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করে এর প্রকৃত আকার সম্পর্কে আরো নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন বর্তমানে সৌরজগতের পাঁচটি বামন গ্রহকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এগুলো হলো- প্লুটো, সেরেস, এরিস, হাউমেয়া ও মাকেমাকে। এর মধ্যে সেরেস মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী প্রধান গ্রহাণু বলয়ে অবস্থিত। অন্য চারটি নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের কাইপার বলয় অঞ্চলে রয়েছে। ২০২৬ ইডি১৩৮ বামন গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এটি হবে সৌরজগতের ষষ্ঠ স্বীকৃত বামন গ্রহ।
দীর্ঘদিন ধরে প্লুটোকে সৌরজগতের নবম ও সর্ববহিঃস্থ গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন গ্রহের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করলে প্লুটো সেই সংজ্ঞার সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ফলে গ্রহের মর্যাদা হারিয়ে বামন গ্রহ হিসেবে পুনর্শ্রেণিভুক্ত হয় এটি। নতুন আবিষ্কৃত বস্তুটি প্লুটোর মতোই সৌরজগতের শীতল ও বরফাবৃত বহিঃপ্রান্তের বাসিন্দা।
গবেষক ম্যাট হোলম্যানের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে রুবিন মানমন্দির ও অন্যান্য শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পাওয়া সম্ভব। আগামী ১০ বছর ধরে রুবিন মানমন্দিরের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশ বারবার পর্যবেক্ষণ করা হবে। ফলে এখনো শনাক্ত না হওয়া বহু মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান মিলতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহরে অনুষ্ঠিত ৫৮তম গ্রহবিজ্ঞান সম্মেলনে আবিষ্কারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন গবেষকরা। ২০২৬ ইডি১৩৮-এর আবিষ্কার ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের ক্ষুদ্র গ্রহকেন্দ্র। তবে চূড়ান্ত স্বীকৃতির আগে এর প্রকৃত আকার, গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরো পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ভেরা সি. রুবিন মানমন্দির, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন ও গবেষণাপত্র।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬