অধিকাংশ মা-বাবাই এখন উদ্বিগ্ন, কারণ শিশু ও কিশোরদের স্ক্রিনে কাটানো সময় ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ভিডিও দেখা, গেম খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো-সব মিলিয়ে ডিজিটাল ডিভাইস এখন দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ। প্রযুক্তি যেমন সুবিধা দিচ্ছে, তেমনি অভিভাবকদের জানা জরুরি-কখন এই ব্যবহার স্বাভাবিক, আর কখন তা শিশুর সুস্থ বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সিওপি নামের একটি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপের মনোবিজ্ঞানী সিন্ধু ইউ ওয়াধওয়ার মতে, স্ক্রিন টাইম নিয়ে আলোচনায় শুধু সময়ের হিসাব নয়, বরং কীভাবে স্ক্রিন ব্যবহার হচ্ছে এবং তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব ফেলছে-এটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব স্ক্রিন টাইমই ক্ষতিকর নয়
বিশেষজ্ঞের মতে, শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা, সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়া, নতুন দক্ষতা শেখা কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা-এসবই ইতিবাচক স্ক্রিন ব্যবহারের অংশ হতে পারে। তবে সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন স্ক্রিন ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, সামাজিক মেলামেশা এবং স্বাভাবিক বিকাশের অন্যান্য দিককে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে।
স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব মনোযোগে
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের একটি বড় প্রভাব পড়ে মনোযোগ ও একাগ্রতায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল ছোট ছোট কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে গেলে শিশুদের দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পড়াশোনা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ কমে যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
একটি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থার মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর মানসিক ও আবেগগত স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্ক্রিন বন্ধ করলে বা সময় সীমিত করলে শিশুদের মধ্যে বিরক্তি, হতাশা বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়তে পারে।
ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিন ব্যবহারের আরেকটি বড় ক্ষতিকর দিক হলো ঘুমের ব্যাঘাত। অনেক শিশু দেরি পর্যন্ত ডিভাইস ব্যবহার করে, যার ফলে ঘুমের মান কমে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মেজাজ, শক্তি, মনোযোগ এবং সার্বিক মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কমিয়ে দিতে পারে। মুখোমুখি কথা বলা, বাইরে খেলাধুলা এবং পারিবারিক সময় শিশুদের সামাজিক দক্ষতা, সহানুভূতি, আত্মবিশ্বাস ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্ক্রিন ব্যবহারে ক্ষতির লক্ষণ
অভিভাবকদের কিছু লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত-
* ডিভাইস ছাড়তে অনীহা
* আগের শখে আগ্রহ কমে যাওয়া
* ঘুমের সমস্যা
* পড়াশোনায় অবনতি
* সামাজিকভাবে দূরে সরে যাওয়া
* আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা
স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং পারিবারিকভাবে কিছু নিয়ম মানলে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। যেমন-খাবারের সময় ও ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখা, বাইরে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া এবং পারিবারিক আলোচনার সময় বাড়ানো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিভাবকরাই যদি ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবহার অনুসরণ করেন, তবে শিশুরাও তা সহজে শিখবে।
সানা/আপ্র/১৭/৬/২০২৬