উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় চলতি শিক্ষাবর্ষে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাস করা সব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হলেও প্রায় সাড়ে আট লাখ আসন শূন্য থেকে যেতে পারে। এতে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকটের আশঙ্কা কম থাকলেও নতুন ও অপেক্ষাকৃত ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
দেশে বর্তমানে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য মোট আসন রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১০ লাখ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় চার লাখ আসন রয়েছে।
অন্যদিকে, এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। সেই হিসাবে উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার আসন ফাঁকা থাকবে।
তবে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের একাংশ পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য যোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে। এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ মনে করেন, বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে আরো অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেন। এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষ পরীক্ষার ফল ও ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা
এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিশেষ পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে এবং ফল প্রকাশে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানান, শিক্ষামন্ত্রী ২ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তবে ডিসেম্বরের মধ্যে ফল প্রকাশিত হলেও নতুন করে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ ডিসেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা জানুয়ারিতে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা ৪ ডিসেম্বর আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
এ অবস্থায় বিশেষ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হলেও অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়সূচির কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, ভর্তি উপকমিটি ২ ডিসেম্বর বৈঠকে বসবে। সেখানে ভর্তির যোগ্যতার মানদণ্ড এবং এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এ জন্য ওই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাঁদের পিছিয়ে রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এ বিষয়ে এখনো তাঁদের কোনো পরিকল্পনা নেই। ভর্তি কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, নতুন করে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কীভাবে ভর্তি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও সচিব চিন্তাভাবনা করছেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
ভর্তির যোগ্যতা শিথিলের সম্ভাবনা
এবারের পরীক্ষায় শুধু পাসের হার নয়, জিপিএর ভিত্তিতেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উত্তীর্ণ ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। জিপিএ-৪-এর বেশি পেয়েছেন ১ লাখ ৮২ হাজার ৭২০ জন।
জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৪-এর মধ্যে পেয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮২৬ জন। ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫০-এর মধ্যে পেয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৭১ জন। অন্যদিকে, জিপিএ-৩-এর নিচে পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী।
জিপিএ-৩-এর নিচে পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করতে পারবেন না। ফলে ভর্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আহছানুল হক মিলন বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কতটা মানের সঙ্গে আপস করে শিক্ষার্থী ভর্তি করবে, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে ভর্তির সুযোগ সবাই পাবেন।
শিক্ষাবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, আসন ফাঁকা থাকলেও ভর্তির যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা উচিত হবে না। এতে উচ্চশিক্ষার মান আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো যোগ্য ও দক্ষ স্নাতক তৈরি করতে পারছে না। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভর্তির শর্ত আরো শিথিল করা হলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে শুধু সনদধারী বেকারের সংখ্যা বাড়বে।
তিনি মনে করেন, যেসব শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দিতে গিয়ে শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করা ঠিক হবে না।
একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এবারের ফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষার্থী ১২ বছর পড়াশোনা করার পর বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেন। এরপরও ১২ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক অকৃতকার্য হওয়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছে। এখন এ সমস্যা সমাধানে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।
উচ্চশিক্ষায় আসন ফাঁকা থাকাকে সমস্যা হিসেবে দেখেন না এই অধ্যাপক। তাঁর ভাষ্য, উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়। অলিগলিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রবণতায় উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে বেকারত্ব বাড়ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করায় শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আসন ফাঁকা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির চাপ কমবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বিশেষ সুযোগ দিয়ে অযোগ্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
সব মিলিয়ে এবারের ভর্তি মৌসুমে একদিকে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা, অন্যদিকে বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ভর্তির যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান বজায় রাখা এবং যোগ্য শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সানা/আপ্র/০৩/১১/২০২৬