দেশের প্রতিটি নির্বাচনই নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশার মহাসমুদ্র। এই প্রত্যাশার মধ্যে দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা সবচেয়ে সংবেদনশীল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গত ১০ মার্চ সারাদেশে একযোগে প্রায় ৩৭,৫৬৭টি নারীর পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, যা সরকারের সমাজ নিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
প্রথম ধাপের বিতরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি মাঠে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে কার্ড তুলে দেন এবং অনলাইনে নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমও চালু করেন। উদ্বোধনী দিনের দৃশ্য, যেখানে শতশত নারীর মুখে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে, প্রমাণ করে যে ফ্যামিলি কার্ড সমাজের অগণিত গৃহবধূর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে সক্ষম। যার প্রভাব বোঝা যাচ্ছে দেশের প্রায় প্রত্যেক পরিবারে। ঘরে ঘরে গৃহবধূদের মধ্যে এই কার্ড নিয়ে উৎসাহীর সংখ্যা এখন অগণিত।
প্রথমত, কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন-মাসে মাত্র আড়াই হাজার টাকা দিয়ে কি সত্যিই নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব? প্রশ্নের যৌক্তিকতা আছে। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল নারীদের জন্য চাকরি, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ বা স্থায়ী ব্যবসার সুযোগ দেওয়া নিতান্ত জরুরি। তবে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব এড়িয়ে গেলেও পরিস্থিতির বাস্তব চ্যালেঞ্জ অগ্রাহ্য করা যাবে না। উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা মানে কেবল অর্থ দান নয়, মানবিক সহায়তা ও সুযোগ সৃষ্টি। ফ্যামিলি কার্ড এমনই একটি উদ্যোগ, যা ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটির শিল্প, কৃষিকাজ বা সামাজিক উদ্যোগে নারীর সক্ষমতা বিকাশে সহায়ক হতে পারে। দিনে একবারও খাবার জোটে না এমন পরিবারে এই সামান্য অর্থ সহায়তা জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য। চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণের ঘোষণাটি কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এটি ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই বর্তমান সরকারের দায়িত্ব প্রতিটি ধাপ ন্যায্য, নিয়মকানুনসম্মত ও প্রযুক্তিভিত্তিকভাবে সম্পন্ন করা।
তৃতীয়ত, সরকারকে সর্বদা মনে রাখতে হবে-সুশাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প স্থায়ী হয় না। উন্নয়ন কার্যক্রম যতই বৃহৎ হোক না কেন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের সঙ্গে মিলিত হলে তা মানুষের আস্থা ও ফলপ্রদতা হারায়। মানুষের প্রত্যাশা শুধু অর্থ নয়; তাঁদের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন ও মর্যাদা বজায় রাখা।
ফ্যামিলি কার্ড শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি নারীর ক্ষমতায়নের শক্তিশালী প্রতীক। সরকারের লক্ষ্য যদি থাকে সত্যিকারভাবে দরিদ্র পরিবার ও নারীদের শক্তিশালী করা, তবে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও তা কর্মক্ষম হওয়া জরুরি। প্রতিশ্রুতির প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করলে এটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে দূরদর্শী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
ফলে, ফ্যামিলি কার্ড যেন শুধুই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি না থেকে একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এটি রাজনৈতিক রঙ বা স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তা থেকে মুক্ত রেখে সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে চালিয়ে নেয়া। সফল হলে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নতুন দিগন্তে পৌঁছাবে, মানুষের প্রত্যাশা ও আশা দৃঢ়ভাবে জ্বালিয়ে রাখবে।
সানা/এসি/১২/০৩/২০২৬