ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক সংঘাত-পর্বের আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক অভিযান শুরু করেছে; যার লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, পরমাণু কর্মসূচি প্রতিহত করা এবং রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করা। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তেহরান থেকে বিস্ফোরণের খবর এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য আবাসস্থলসংলগ্ন এলাকায় ধোঁয়ার চিহ্ন এই বার্তাই দিচ্ছে যে ঘটনাটি শুধু প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতিগত ভারসাম্য এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ঘটনাটি শুধু সামরিক আঘাতের সীমায় আবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং জননিরাপত্তাকে ঘিরে এক জটিল বাস্তবতার সূচনা, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন দাবি করে। বর্তমান সংঘাত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে- প্রথমত, মার্কিন সামরিক শক্তির প্রকাশ্য প্রদর্শন; দ্বিতীয়ত, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ; তৃতীয়ত, ইসরায়েলের কৌশলগত ভূমিকা; এবং চতুর্থত, পাহলভি রাজবংশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের প্রশ্ন। ‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি ও পরিণতি’ শীর্ষক এই প্রবন্ধে উল্লিখিত বিষয়গুলোর একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সমন্বিত পর্যালোচনা উপস্থাপনের প্রয়াস নেওয়া হলো-
মার্কিন সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন: বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপট চারটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে; যার মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে সুস্পষ্ট হলো মার্কিন সামরিক ক্ষমতার প্রকাশ। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানকে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার এক সরাসরি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। সামরিক শক্তি প্রদর্শন শুধু প্রতিদ্বন্ধী রাষ্ট্রকে দেখানোর জন্য নয়; মূলত রাজনৈতিক সংকেত এবং কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার নাটকীয়তা—যা কখনো ‘কূটনৈতিক দ্বন্ধ’ বা ‘সাংঘাতিক উত্তেজনা’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে, মূলত সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করার একটি চালাকি। এই নাটকের মাধ্যমে কার্যকর হামলার জন্য সময় ও সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে; যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ এই পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছে না। ক্রমবর্ধমান জনমত এবং রাজনৈতিক সমালোচনা নির্দেশ করছে যে, নাগরিকরা এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বতন্ত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে দেখছেন। তবু করপোরেট সংবাদমাধ্যমগুলো, বিশেষত প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রকাশনা—এই অভিযানকে ‘প্রতিরোধমূলক আক্রমণ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যস্ত, যাতে রাজনৈতিক এবং কৌশলগত উদ্দেশ্যকে ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক হিসেবে দেখানো যায়। ফলে মার্কিন সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন শুধু একটি সামরিক কৌশল নয়; আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জনমতের চাপ এবং মিডিয়ার ব্যাখ্যা- সব মিলিয়ে একটি জটিল কৌশলগত দৃশ্যপটের অংশ হিসেবে কাজ করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
ইরান ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: ইরান দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। দেশটির অর্থনীতি স্থিতিশীল নয়; মূল্যস্ফীতি এবং রোজগারের অভাব জনগণের জীবনযাত্রাকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করছে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা সামাজিক অসন্তোষের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা, বিশেষত তেলের রফতানি ও ব্যাংকিং খাতে- অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে; যা সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দেশে ৯ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি এই সংকটের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সংঘাতের সম্ভাবনা বা আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যদি সংঘাত বিস্তৃত হয়, তবে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজন তীব্র হয়ে ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ শুধু দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। কারণ রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রভাব তাদের জীবনযাত্রা এবং নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
ইসরায়েলের ভূমিকা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র ইসরায়েল সম্প্রতি ফিলিস্তিন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযান শুধু প্রতিশোধ বা সীমান্ত সুরক্ষার জন্য নয়; বরং ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিকল্পিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনা ও নিন্দা এড়াতে ইসরায়েল তার কর্মকাণ্ডকে নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত রাখার কৌশল ব্যবহার করছে।
ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রভাব বৃদ্ধি করা, বিশেষত এমন অঞ্চলে যেখানে তার কৌশলগত দখল নিশ্চিত করা যায়। একদিকে তারা ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরানকে ভাঙার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করার পরিকল্পনা করছে। এই প্রক্রিয়ায় অঞ্চলীয় ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলো, বিশেষত তুরস্ক এবং পাকিস্তান ও ইসরায়েলের পরিকল্পনার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে, ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ শুধু সাময়িক সংঘাত সৃষ্টি করছে না; এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য, শক্তির ভারসাম্য এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া এই পদক্ষেপের প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার উপর পড়ছে; যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এবং কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন করছে।
পাহলভি রাজবংশ ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব: পাহলভি বংশ; যাদের শাসন প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইরানিরা উৎখাত করেছিল- আজও রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষা ধরে রেখেছে। তবে জনমত তাদের শাসন পুনঃস্থাপনের পক্ষে নয়। তারা আন্তর্জাতিক শক্তি, বিশেষত ইসরায়েল ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বর্তমান সংঘাতের কৌশলগত কার্যক্রমে জড়িত। এই অংশীদারিত্ব মূলত মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি প্রায়শই সাধারণ জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ কেন্দ্র করে। প্রচারমাধ্যমের কৌশলগত বাছাই, রূপান্তরিত তথ্য এবং একপক্ষীয় রিপোর্টিং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ঝঁকি ও অস্থিরতার বাস্তব চিত্রকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
এ চারটি বাস্তবতা তথা মার্কিন সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন, ইরানের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ, ইসরায়েলের কৌশলগত পদক্ষেপ ও পাহলভি বংশের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে, বর্তমান সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক লক্ষ্য পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে। সংঘাতের ফলে মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক বিভাজনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে; যা শুধু দেশীয় নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান সংঘাতের মূল উদ্দেশ্য কোনো দেশের স্বাধীনতা বা সাধারণ জনগণের মুক্তি নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। সংঘাতের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর—যারা তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকা সত্ত্বেও সহিংসতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক অস্থিরতার মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এখন সময়ের প্রয়োজন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের প্রচেষ্টা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
sarkerjahangiralam78@gmail.com
আপ্র/কেএমএএ/০৭.০৩.২৬