থানার সামনে লেখা থাকে, ‘সেবাই পুলিশের ধর্ম’। মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা এই অঙ্গীকারের মূল কথা। অপরাধীর দমন, নিরপরাধের সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পুলিশের দায়িত্ব। অথচ দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অপরাধের বিস্তার প্রশ্ন তুলছে, পুলিশ কি দায়িত্ব পালনের যথাযথ সুযোগ ও সক্ষমতা পাচ্ছে? পুলিশকে দুর্বল রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য, পুলিশের ৬৪ শতাংশ যানবাহনের বয়স ১০ বছরের বেশি। দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি যানবাহন। দুই প্রকল্পে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পুরোনো গাড়ি ও অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম নিয়ে পুলিশ কীভাবে দ্রুত অপরাধস্থলে পৌঁছাবে, অপরাধীকে ধাওয়া করবে কিংবা বিপন্ন নাগরিককে উদ্ধার করবে? স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, দ্রুত সরবরাহ, থানাভিত্তিক সুষম বণ্টন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আগে ও পরে পুলিশের ভূমিকা ও জনআস্থার সংকট গভীর হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে বাহিনীকে ব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড এবং তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতাও উপেক্ষণীয় নয়। সদস্যদের জীবন, মর্যাদা ও মনোবল রক্ষা না করে তাঁদের কাছ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ সক্রিয়তা আশা করা যায় না। সরকারকে তাঁদের নিরাপত্তা ও পেশাগত আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।
পুলিশপ্রধান আলী হোসেন ফকির বলেছেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজন হলে পুলিশ বিচারবহির্ভূত গুলিবর্ষণও করবে। এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট হওয়া দরকার, পুলিশের শক্তি অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে, বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতায় নয়। জীবন রক্ষায় অপরিহার্য পরিস্থিতিতে আইনসম্মত ও আনুপাতিক শক্তি প্রয়োগের সুযোগ থাকতে হবে; প্রতিটি গুরুতর ঘটনার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীকে দমন করতে হবে, কিন্তু নিরপরাধ কাউকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার লক্ষ্যবস্তু করা চলবে না। অর্থাৎ পুলিশ যেন লাইসেন্সধারী সরকারি অপরাধী হিসেবে কোনোভাবেই পরিচিত না হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অপরাধী শনাক্তকরণে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অপরাধের নথি, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত কাজে লাগিয়ে পরিচিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক অভিযান চালাতে হবে। দুর্বল তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীর মুক্তি ঠেকাতে হবে। ২০২৪ সালের পর কারাগার থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। পুলিশ, আদালত ও কারা প্রশাসনের সমন্বিত সংস্কার ছাড়া এসব সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সরকারের করণীয় এখন সুস্পষ্ট। প্রথমত, যানবাহন, অস্ত্র, সুরক্ষাসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, পুলিশ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা, ন্যায্য কর্মপরিবেশ এবং নিহত সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনের পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে। পঞ্চমত, তদন্ত, বিচার ও কারা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করে অপরাধীদের আইনের আওতায় রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ষষ্ঠত, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে স্বাধীন পর্যালোচনা, অভিযোগ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, কমিউনিটি পুলিশিং, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নির্ধারিত সময়সীমা, পর্যাপ্ত বাজেট, স্বচ্ছতা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান ফলাফলই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
একটি স্পষ্ট বিষয় হলো-পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, জনগণের নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। শক্তিশালী পুলিশ মানে নির্যাতনকারী বা জবাবদিহিহীন পুলিশ নয়; বরং দক্ষ, সাহসী, মানবিক ও নিরপেক্ষ বাহিনী। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নিশ্চিত করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে, পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কঠোর জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে। মনে রাখা জরুরি-পুলিশের হাত বেঁধে রেখে অপরাধীর দৌরাত্ম্য ঠেকানো যায় না, আবার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন আইনের শক্তিতে শক্তিশালী পুলিশ, জনগণের আস্থায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র।
সানা/আপ্র/২৭/১০/২০২৬