জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেলে, তাহলে বাজারে নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা কোথায়? একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এমন অস্থিরতা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ কার কাছে প্রতিকার চাইবে? সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হওয়ার ব্যাখ্যা কে দেবে-ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, নাকি বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থা? এই প্রশ্নগুলোর জবাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষা এখন সরকারের জরুরি দায়িত্ব।
গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, এমনকি ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দামের এত ব্যবধান কেন, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। মূল্য নির্ধারণের পরও ভোক্তাকে যদি বাড়তি অর্থ গুনতে হয়, তবে সেই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাজারের ওপর মানুষের আস্থা কমবে এবং সরকারের মূল্যনিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এই অস্থিরতার মধ্যে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কমিশন বৃদ্ধি, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ সাত দফা দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি। ব্যবসায়ীদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য দুই দিন দেশব্যাপী বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে কার্যত জিম্মি করার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কোনোভাবেই দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হতে পারে না। ব্যবসায়িক বিরোধের দায় ভোক্তাকে বহন করতে হবে কেন? নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং এলপিজিনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচ্য।
ব্যবসায়ীরা পাঁচ বছর আগে নির্ধারিত সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের সাত শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। পরিবহন, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, কর্মচারীর বেতন, গুদামভাড়া ও লাইসেন্স ফি বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিরপেক্ষ ব্যয়সমীক্ষার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একইভাবে, কোম্পানির চালানে প্রকৃত দাম উল্লেখ, পরিবেশকের গুদামে পণ্য পৌঁছে না দিলে ন্যায্য পরিবহনভাড়া প্রদান, পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং অযৌক্তিক জরিমানার অভিযোগ তদন্ত করা দরকার। তবে এসব দাবির নিষ্পত্তি হতে হবে স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক প্রক্রিয়ায়। কোনো পক্ষের দাবিই যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করা কিংবা ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষা করা সমীচীন নয়।
সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। ব্যবসায়ী সমিতির অভিযোগ, ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানি নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না এবং ঋণপত্র খুলতে না পারায় কয়েক লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন দেশে পর্যাপ্ত আমদানি ও সরবরাহের দাবি করেছে। প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে আমদানি, মজুত, কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহ এবং খুচরা বিক্রির তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি। বাজারে প্রতিযোগিতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগও তদন্ত করতে হবে। সরবরাহে ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে হবে; আর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারকে অবিলম্বে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিক্রি বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহারে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বাজার তদারকি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিতকরণ এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে জনস্বার্থ রক্ষায় আইনসম্মত বিকল্প সরবরাহব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখতে হবে। তদারকি হতে হবে কঠোর, তবে ন্যায়সংগত; ব্যবসায়ীদের হয়রানি যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া যাবে না।
এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এখন আর কেবল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থে সরকারের দায়িত্বের প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চান, কোনো পক্ষের বিরোধের জিম্মি হতে চান না। ব্যবসায়ীদের ন্যায্য দাবি বিবেচনা করতে হবে, কিন্তু ভোক্তাকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের কৌশল গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারকে এমন কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে নির্ধারিত দাম বাস্তবে কার্যকর হয়, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে এবং বাজারে কোনো পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ না থাকে। এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য বন্ধ করে ন্যায্য মূল্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই হবে-ভোক্তার স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
সানা/আপ্র/১৪/১০/২০২৬