দীর্ঘক্ষণ মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চোখে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, পানি পড়া কিংবা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চোখে খসখসে অনুভূতিও হতে পারে। বিশেষ করে বিরতি না নিয়ে দীর্ঘ সময় পর্দা ব্যবহার করলে এ ধরনের অস্বস্তি বাড়ে। সাধারণত ডিজিটাল চোখের ক্লান্তি ও শুষ্কতার কারণে এসব উপসর্গ দেখা দেয়।
চোখের এই অস্বস্তি সব সময় স্থায়ী ক্ষতির লক্ষণ নয়। তবে একে শুধু পর্দার উজ্জ্বলতার সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। চোখের পলক কম ফেলা, কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার, শুষ্ক বাতাস এবং আগে থেকে থাকা চোখের সমস্যাও জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে।
কেন চোখে জ্বালাপোড়া হয়
চোখের উপরিভাগে অশ্রুর একটি পাতলা স্তর থাকে, যা চোখকে আর্দ্র রাখে। প্রতিবার চোখের পলক ফেললে অশ্রু চোখের উপরিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মুঠোফোন বা অন্য পর্দার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে স্বাভাবিকের তুলনায় পলক কম পড়ে। অনেক সময় চোখের পলক পুরোপুরি বন্ধও হয় না। ফলে অশ্রুর স্তর ঠিকভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারে না এবং চোখে শুষ্কতা, জ্বালা ও অস্বস্তি দেখা দেয়।
দীর্ঘক্ষণ কাছের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার জন্যও পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে চোখের ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং দৃষ্টি সমন্বয়ের সমস্যা হতে পারে। এসব উপসর্গকে একত্রে ডিজিটাল চোখের ক্লান্তি বলা হয়।
২০২২ সালে প্রকাশিত ‘অপথালমোলজি থেরাপি’ সাময়িকীর একটি পর্যালোচনায় শুষ্ক চোখ, পানি পড়া, ঝাপসা দৃষ্টি ও মাথাব্যথাকে ডিজিটাল চোখের ক্লান্তির সাধারণ উপসর্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ঘন ঘন পলক ফেলা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং পর্দার সঠিক অবস্থান বজায় রাখার মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়।
ফোন ব্যবহার ও শুষ্ক চোখের সম্পর্ক
২০২১ সালে ‘মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় স্মার্টফোন ব্যবহার ও শুষ্ক চোখের রোগের মধ্যকার সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে চারটি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া গেলেও গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত পার্থক্যের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার করলেই যে চোখের শুষ্কতা তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে যাঁদের চোখে আগে থেকেই শুষ্কতার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
চোখের জ্বালার জন্য কি নীল আলো দায়ী
পর্দা থেকে নির্গত নীল আলোকে প্রায়ই চোখের ক্লান্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু নীল আলো আটকানোর বিশেষ চশমা ডিজিটাল চোখের ক্লান্তি কমায়—এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
কোচরেনের একটি পর্যালোচনায় ৬১৯ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত ১৭টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সাধারণ লেন্সের তুলনায় নীল আলো প্রতিরোধী লেন্স স্বল্পমেয়াদি চোখের ক্লান্তি কমাতে সামান্য বা কোনো উপকারই দেখায়নি। ঘুমের ক্ষেত্রে এসব লেন্সের উপকারিতা সম্পর্কেও প্রমাণ অনিশ্চিত ছিল।
তাই ফোন ব্যবহারের সময় চোখের অস্বস্তি কমাতে শুধু নীল আলো প্রতিরোধী চশমার ওপর নির্ভর না করে পলক ফেলা, বিরতি নেওয়া এবং পর্দার ব্যবহার-পদ্ধতি ঠিক করার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাতে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সেটিকে চোখের জ্বালার একমাত্র কারণ বলা যায় না।
চোখের জ্বালাপোড়া কমাতে যা করবেন
২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন: প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান।
সচেতনভাবে পলক ফেলুন: পড়া বা স্ক্রল করার সময় ধীরে ধীরে এবং পুরোপুরি চোখের পলক ফেলার চেষ্টা করুন।
ফোন চোখ থেকে দূরে রাখুন: সাধারণভাবে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ফোন রাখা আরামদায়ক হতে পারে। তবে দৃষ্টিশক্তি ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী দূরত্ব বদলাতে পারে।
লেখা বড় করুন: ছোট লেখা পড়তে চোখ কুঁচকে তাকানোর পরিবর্তে অক্ষরের আকার বাড়িয়ে নিন।
পর্দার উজ্জ্বলতা ঠিক রাখুন: ঘরের আলোর সঙ্গে মিল রেখে উজ্জ্বলতা সমন্বয় করুন। জানালা বা বাতির আলো যেন পর্দায় প্রতিফলিত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখুন।
নিয়মিত বিরতি নিন: একটানা ফোন ব্যবহার না করে মাঝে মাঝে ফোন সরিয়ে রেখে দূরে তাকান এবং চোখকে বিশ্রাম দিন।
শুষ্ক বাতাস এড়িয়ে চলুন: ফ্যান বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বাতাস সরাসরি চোখে লাগতে দেবেন না।
পর্যাপ্ত ঘুমান: দীর্ঘ সময় পর্দা ব্যবহারের পাশাপাশি ঘুমের ঘাটতিও চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পরও চোখের শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলে চোখ আর্দ্র রাখার উপযোগী ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখের লালচে ভাব কমানোর জন্য তৈরি ড্রপ নিয়মিত ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ সেগুলো মূল সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে।
চোখে তীব্র ব্যথা, হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া বা উল্লেখযোগ্য দৃষ্টির পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকে শুধু ফোন ব্যবহারের ফল ধরে না নিয়ে এর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
এসি/আপ্র/১৪/১০/২০২৬