মাহাবুব রহমান বিপ্লব, বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বদরগঞ্জে ঘটে যায় এক নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। সারাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক একদিন আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চৌধুরী পরিবারের দীর্ঘদিনের আধিপত্য কার্যত ভেঙে পড়ে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও পাল্টা মিছিল নিয়ে রাজপথে নামে। একপর্যায়ে বদরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন ও জীতেন দত্ত মঞ্চসংলগ্ন এলাকায় দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় দৈনিক আমাদের সময়-এর বদরগঞ্জ প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার ঘটনাস্থলের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী তার ওপর হামলা চালিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সড়কে আছড়ে ভেঙে ফেলে।
সাংবাদিকের ওপর হামলা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বেলা ১২টার দিকে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটে স্থানীয় চৌধুরী বাড়িতে আশ্রয় নেয়।
এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা চৌধুরী বাড়ি ঘেরাও করে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপজেলায়। একপর্যায়ে বদরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডিউক চৌধুরী, পৌর মেয়র টুটুল চৌধুরী এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুইট চৌধুরীর বাসভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। চৌধুরী বাড়ির ভেতরে থাকা কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলও টেনে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে গেলে পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বাড়ির পেছনের উঁচু সীমানা প্রাচীর টপকে পালিয়ে যান। এ ঘটনাকে অনেকেই বদরগঞ্জে চৌধুরী পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসানের প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।
ঘটনার পর ৪ আগস্ট রাতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রায় তিনশ জনকে আসামি করে বদরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে পরদিন ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেই অভিযোগ আর নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতীয় পর্যায়ের পরিবর্তনের আগেই বদরগঞ্জের ছাত্র-জনতা নিজেদের উদ্যোগে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তাদের দাবি, ৪ আগস্টের ঘটনাই বদরগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, পতনের পর ডিউক চৌধুরী, টুটুল চৌধুরী, সুইট চৌধুরীসহ চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা পলাতক রয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ থেকে তিনবার নির্বাচিত বদরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি উত্তর কুমার সাহা এলাকায় অবস্থান করে দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সানা/আপ্র/৪/৮/২০২৬