গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

জন্মের পাঁচ দিন পর মাকে হারায় আরফা, এবার ডেঙ্গু নিয়ে গেল বাবাকে

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৪১ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:১৮ এএম ২০২৬
জন্মের পাঁচ দিন পর মাকে হারায় আরফা, এবার ডেঙ্গু নিয়ে গেল বাবাকে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

‘আমি তো এতিম হয়ে গেলাম। আমি এখন কার কাছে থাকব? সবার বাবা-মা আছে। আমার তো আগে মা ছিল না, কিন্তু বাবা ছিল। মানুষের হয় বাবা থাকে, না হয় মা থাকে। কিন্তু এখন আমার বাবা-মা কেউই নেই।’

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল নয় বছরের আরফা। জন্মের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল সে। মায়ের কোনো স্মৃতিই নেই তার। বাবা তাজুল ইসলাম তাজু ছিলেন তার বাবা, আবার মায়ের ভূমিকাতেও তিনিই ছিলেন। বাবাকে ঘিরেই ছিল আরফার পুরো পৃথিবী। কিন্তু ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারিয়ে এখন সত্যিই এতিম সে।

‘স্কুলে গেলে বন্ধুদের যখন মা নিতে আসত, তখন আমার মন খারাপ হতো। মায়ের অভাব বুঝতাম। কিন্তু আমার বাবা তো আমাকে নিতে আসত। মা না থাকলেও ভাবতাম, আমার বাবা আছে। এখন তো বাবাও নেই। আর কোনোদিন বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে না, ঘুরতে নিয়ে যাবে না।’

২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় আরফার। জন্মের পর শারীরিক দুর্বলতার কারণে তার মা মারুফা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ছোট্ট আরফাকে পাশে শুইয়ে রেখে পানি খেতে উঠেছিলেন মারুফা। হঠাৎ মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান তিনি।

একই কক্ষে থাকা মারুফার মা ছুটে এসে দেখেন, অস্ত্রোপচারের সেলাই ফেটে শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। চিকিৎসক এসে পরীক্ষা করে জানান, মারুফা আর বেঁচে নেই।

পৃথিবীতে আসার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মায়ের স্নেহ হারায় আরফা। এরপর বাবা তাজুল ইসলাম তাজুই হয়ে ওঠেন তার পুরো পৃথিবী। ঢাকার রামপুরার ওয়াপদা রোড এলাকায় বাবা ও দাদা-দাদির সঙ্গে বড় হতে থাকে সে। প্রতিদিন বাবা তাকে স্কুলে দিয়ে আসতেন, আবার ছুটির পর নিয়ে আসতেন। ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন। মায়ের অভাব যাতে মেয়েকে বুঝতে না হয়, সেভাবেই আগলে রাখতেন তাজুল। শুধু মেয়ের কথা চিন্তা করে আর বিয়েও করেননি তিনি।

তাজুলের মা ছকিনা বেগম জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে দোকান থেকে বাসায় ফিরে তাজুল তাকে বলেন, ‘মা, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে। মাথায় পানি ঢেলে দাও।’

ছকিনা ছেলের মাথায় পানি ঢেলে শরীর মুছে দেন। পরে ভাত মেখে খেতে দিলে তাজুল অল্প একটু ভাত খেয়ে একটি নাপা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন সকালেও তার জ্বর ছিল। ফজরের নামাজ পড়ে তাজুল মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মা, আরফাকে তুমি স্কুলে নিয়ে যাবে, না আমি নিয়ে যাব?’ ছকিনা তাকে বিশ্রাম নিতে বলেন।

সকাল ৭টার দিকে কলা ও পাউরুটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বমি শুরু হয় তাজুলের। তার ভাই ও বাবা মিলে বমি পরিষ্কার করেন। আরফাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে ছকিনা এক বন্ধুকে তাজুলকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু বাসায় ফিরে তাজুল তখনও বলছিলেন, ‘লাগবে না, এমনিতেই ভালো হয়ে যাব।’

সকাল ১০টার দিকে জানা যায়, তিনি দোকানের পাশের হলি ফ্যামিলির এক চিকিৎসকের কাছে গেছেন। চিকিৎসক ওষুধ ও স্যালাইন দেন। বাসায় ফিরে স্যালাইন নেওয়া শুরু করেন তাজুল।

একটি স্যালাইন শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা বাজে। এরপর ভাইকে তাজুল বলেন, ‘আরেকটা স্যালাইন দিয়ে দাও। যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই ভালো। সারারাত শুয়ে থাকতে ভালো লাগবে না।’

কিন্তু দ্বিতীয় স্যালাইন চলার সময় আবার অনবরত বমি শুরু হয়। বুকব্যথাও বাড়তে থাকে। দ্রুত তাকে খিদমা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সুবিধা না থাকায় অন্য হাসপাতালে নিতে হবে।

পরে তাজুলকে বেটার লাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরপরই পরীক্ষা করা হলে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে জানা যায়, তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং তার অবস্থা গুরুতর। তার রক্তচাপ কমে যায়, দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। স্যালাইন চললেও বমি থামছিল না।

পরদিন সকালে ছেলেকে দেখতে গিয়ে ছকিনা বেগম দেখেন, কয়েকজন মিলে তাজুলকে ধরে রেখেছেন। তিনি শুধু ছটফট করছিলেন।

কাঁদতে কাঁদতে ছকিনা বলেন, ‘দেখেই বুঝছিলাম, আমার ছেলের সময় শেষের দিকে।’

পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে সেদিনই তাজুলকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হলেও তাকে আর সুস্থ করা যায়নি।

১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে ৩৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তাজুল ইসলাম তাজু। পরদিন সকাল সাড়ে ১১টায় কুমিল্লার দেবিদ্বারে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মারুফার চাচি ফারহানা আক্তার বলেন, ‘তাজু ভাই অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই আরফা কান্নাকাটি করছিল। আমরা বারবার বলতাম, তোমার বাবা সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু মৃত্যুর খবর শোনার পর মেয়েটা পাগলের মতো হয়ে যায়। তার কান্নায় পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো মানুষ ছিল না, যে তাকে দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পেরেছে।’

আরফার দাদু বলেন, ‘আমার নাতি এতদিন এতিম ছিল না। বাবাকে হারিয়ে এবার এতিম হয়ে গেল। এখন আমি তাকে দেখে রাখব। আমারও বয়স হয়েছে, কতটুকু পারব জানি না।’

জন্মের পাঁচ দিনেই মাকে হারিয়েছিল আরফা। এরপর বাবার হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল তার ছোট্ট পৃথিবী। নয় বছর বয়সে সেই বাবাকেও হারিয়ে এখন পৃথিবীটাই যেন শূন্য হয়ে গেছে তার। মাথার ওপর থেকে সরে গেছে শেষ আশ্রয়টুকুও।
সানা/আপ্র/২৫/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনে নীতিগত অনুমোদন
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনে নীতিগত অনুমোদন

সাইবার অপরাধ তদন্ত ও ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রমকে স্থায়ী ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে বাংলাদেশ পুলিশে...

বেকারি পণ্যে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেকারি পণ্যে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?

১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকা। অর্থাৎ এক লাফে দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। কোথাও ১৫ টাকার পণ্য ২০ টাকা, ২০ টাকার প...

ইলেকট্রিশিয়ান বলে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইলেকট্রিশিয়ান বলে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে

পরিবার পেলো যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর খবর

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে বৃদ্ধ
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে বৃদ্ধ

মৃত্যুদণ্ড কমে সাজা ১০ বছর

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে